ইবাদতে ইখলাসের গুরুত্ব ও বরকত

প্রকাশিত: ২:১৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২১

ইবাদতে ইখলাসের গুরুত্ব ও বরকত

ধর্ম-দর্শন ডেস্ক : মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের ওপর স্রষ্টার হক রয়েছে। ফরজ-ওয়াজিব থেকে শুরু করে সাধারণ নফল কিংবা দু-এক টাকা দান-খয়রাতসহ সব কিছুই এ হক আদায়ের আওতাভুক্ত। সামগ্রিক অর্থে এ সবগুলোকে আমরা ইবাদত বলে থাকি।

 

প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন রকমের ইবাদত করি, জীবন যাপনে মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করি। এ ইবাদত পালন কিংবা বিধি-বিধান মেনে চলার যেটুকু প্রচেষ্টা আমরা আমাদের সাধ্যমতো চালিয়ে যাচ্ছি, এর হিসাব-নিকাশ জমা হচ্ছে অপার্থিব আমলনামায়।

 

কোরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত সত্য হল-ইখলাস সব আমলের গ্রহণযোগ্যতার প্রথম শর্ত। ইখলাস বিহীন কোনো কিছুই আসমানি দরবারে কবুলযোগ্য নয়।  ইবাদত-বন্দেগিসহ যে কোনো ভালো কাজের জন্যই ইখলাস বা একনিষ্ঠতার গুরুত্ব অনেক বেশি। যে কোনো কাজেই ইখলাস না থাকলে সে কাজ মূল্যহীন। কারণ মানুষের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তথা ভেতরে ও বাহিরের কাজে মিল থাকার নামই ইখলাস। সে কারণেই ছোট কিংবা বড়, কম-বেশি আমল-ইবাদতে মিল থাকলেই কেবল মিলবে বরকত। হাদিসের বর্ণনায় তা সুস্পষ্ট-

 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঈমানকে খাঁটি কর, অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে।’ (বায়হাকি)

 

আমল-ইবাদত বা যে কোনো ভালো কাজ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা খুশি করানোর জন্য বেশি আমলের প্রয়োজন নেই। বরং আমল কম হোক কিন্তু তাতে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ইখলাস বা একনিষ্ঠতা থাকলেই কেবল মিলবে বরকতময় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর ইখলাস না থাকলে সব আমলই হবে মূল্যহীন।

 

একনিষ্ঠতার গুরুত্ব
এ কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমের একাধিক আয়াতে খাঁটি মনে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-

 

১. وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
তাদের (নবী-রাসুলদের) এছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে এবং জাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।’ (সুরা বাইয়্যেনাহ : আয়াত ৫)

 

২. قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ
‘(হে রাসুল! আপনি) বলুন, আমি একনিষ্ঠতার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি। [সুরা যুমার : আয়াত ১১)

 

৩. أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
জেনে রাখুন! একনিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত।

 

তাহলে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা কী?
শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ইবাদতসহ যাবতীয় কাজ (একনিষ্ঠতার সঙ্গে) সম্পাদন করার নামই ইখলাস। ইবাদতসহ সব কাজে- কে আমাকে দেখছে, আর কে দেখছে না; সেটা না ভেবে বরং সর্বক্ষণ প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখছেন- ’এই ভয় ও ভাবনা মাথায় রেখে ইবাদত-বন্দেগি ও কাজ করার নামই ইখলাস বা একনিষ্ঠতা।

 

আল্লামা জুরজানি রাহমাতু্ল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘মানবাত্মার পরিচ্ছন্নতায় বিঘ্ন ঘটায় এ ধরনের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা থেকে অন্তর খালি করাই ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। আর এটার মূলকথা হচ্ছে- প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে এ কথা চিন্তা করা, তার সঙ্গে কোনো না কোনো বস্তুর সংমিশ্রণ থাকতে পারে, তবে যখন কোনো বস্তু অন্য কিছুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত হয়, তখন তাকে খাঁটি বস্তু বলা হয়। আর এ খাঁটি করার কাজটি সম্পাদন করার নাম হচ্ছে ইখলাস।’ (মাদারেজুস সালেকিন)

 

আল্লামা হুজাইফা আল মুরআশি রাহমাতু্ল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘বান্দার ইবাদত প্রকাশ্য ও গোপনে উভয় অবস্থাতে একই পর্যায়ের হওয়ার নাম ইখলাস।’ (আত-তিবইয়ান ফি আদাবে হামালাতিল কুরআন)

 

ইখলাসের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান সময়ে উম্মতে মুসলিমাহ এক নাজুক পরিস্থিতি অতিবাহিত করছে। চরম এ সংকটময় মুহূর্তে ইখলাসের সঙ্গে আমল করার বিকল্প নেই। ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে কাজে হবে শুধু আল্লাহর জন্য। আর তাতে মিলবে বরকত। আল্লাহ তায়ালা এ কাজের ধরণ এভাবে তুলে ধরেছেন-

 

‘তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহকে ভালোবেসে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের আহার দেয়। (তারা বলে) শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার দান করি। তোমাদের কাছে আমরা কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা আদ-দাহর : আয়াত ৭-৯)

 

ইখলাস বা একনিষ্ঠতার বরকত যে অনেক বেশি তা প্রমাণ করতেই ইমাম বুখারি (রাহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারির প্রথম হাদিসেই জানিয়েছে দিয়েছেন যে-‘সব কাজ বা আমল নিয়তের (ইখলাস/একনিষ্ঠতার) ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি)

 

মূল কথা হলো-
ইখলাসবিহীন ইবাদত আল্লাহর কাছে মূল্যহীন। ইসলামে এমন কিছু আমল রয়েছে, যেগুলোর জন্য ইখলাস বেশি প্রয়োজন। না হলে ওইসব ইবাদত পরকালে কোনো কাজে আসবে না। বিশেষ করে-
১. সৃষ্টির সেবা;
২. সুন্দর আচরণ;
৩. মানবতা;
৪. সহানুভূতি ও
৫. দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব রক্ষার মতো আমলের ক্ষেত্রে ইখলাস থাকা অপরিহার্য।

 

ইখলাস বা একনিষ্ঠতার বরকত
মুমিন মুসলমানের অন্তরে যখন ইখলাস বা একনিষ্ঠতা থাকবে, তখন সে ইখলাসের অনেকগুলো উপকারিতা ও গুরুত্বপূর্ণ বরকত পাবে। তাহলো-

 

১. আমল কবুল হবে
হজরত আবু উমামা আল বাহেলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহতায়ালা শুধু ওই আমল কবুল করবেন, যে আমল কেবল আল্লাহর জন্য করা হবে এবং আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা উদ্দেশ্য হবে।’ নাসায়ি : ৩১৪০

 

২. সাওয়াব স্থির হবে
হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যখনই তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোনো খরচ করবে, তার ওপর তোমাকে সাওয়াব দেওয়া হবে।’ (বুখারি)

 

৩. ছোট আমল বড় আমলে পরিণত হবে
আল্লামা ইবনুল মোবারক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘অনেক ছোট আমল আছে (এ আমলের) নিয়ত তাকে বড় করে দেয়, আবার অনেক বড় আমল আছে, নিয়ত তাকে ছোট করে দেয়।’ (জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম)

 

৪. গোনাহ মাফ হয়ে যাবে
ইখলাস গোনাহ মাপের বড় কারণ। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহ.) বলেন, ‘এক প্রকার আমল এমন আছে, যখন কোনো মানুষ আমলটি পরিপূর্ণ ইখলাস ও আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে করে, আল্লাহ তায়ালা এ আমলের দ্বারা তার কবিরা গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ হাদিসে এসেছে-

 

হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে সমগ্র মাখলুকের সামনে উপস্থিত করা হবে, তারপর তার জন্য নিরানব্বইটি দপ্তর (হিসাবের খাতা) খোলা হবে, প্রতিটি দপ্তর চোখের দৃষ্টির সমান দূরত্ব। তারপর আল্লাহ বলবেন, তুমি কী এর কোনো কিছুকে অস্বীকার কর? তখন সে বলবে- ‘না’, হে আমার প্রভু! তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার ওপর কোনো জুলুম করা হবে না। তারপর তার জন্য হাতের তালুর সমপরিমাণ একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে, তাতে লিপিবদ্ধ থাকবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই। তখন সে বলবে, এতগুলো বড় বড় দপ্তরের মোকাবিলায় এ কাগজের টুকরোটি কোথায় পড়ে থাকবে? তারপর এ কাগজের টুকরোটি একটি পাল্লায় রাখা হবে এবং দপ্তরসমূহ অপর পাল্লায় রাখা হবে। তখন কাগজের টুকরোর পাল্লাটি ভারী হয়ে যাবে এবং দপ্তরসমূহ হালকা হয়ে পড়বে।’ (তিরমিজি)

 

মনে রাখতে হবে
যেহেতু আমল-ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য ইখলাস বা একনিষ্ঠতার প্রয়োজন খুবই বেশি। যারা ইবাদত বন্দেগিতে একনিষ্ঠ তারাই মুখলিস। তাদের গুণাবলী হবে এমন-
১. তারা প্রসিদ্ধি লাভ, সুনাম ও প্রশংসা পাওয়া কিংবা নিজেদের গুণাগুণ বর্ণনা করাকে পছন্দ করেন না;
২. তারা দ্বীনের জন্য আমল করতে পছন্দ করেন;
৩. নেক আমলের প্রতিযোগিতা করেন;
৪. আমলের বিনিময় শুধু আল্লাহর কাছেই চান।
৫. তারা আমল-ইবাদতসহ সব কাজে ধৈর্যধারণ করেন;
৬. কোনো অভিযোগ-অজুহাত পছন্দ করেন না;
৭. নিজেদের আমলকে গোপন রাখতে ভালোবাসেন, গোপনে আমল করেন এবং তাদের বেশির ইবাদত-বন্দেগি ও ভালো কাজ লোক চক্ষুর অন্তরালেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রকাশ্য আমলের চেয়ে তাদের গোপন আমলের সংখ্যা অধিক হয় থাকে। এসব গুণের অধিকারীরাই আল্লাহর কাছে মুখলিস বা একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে পরিচিত।

 

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগিসহ সব ভালো কাজ করার তাওফিক দান করুন। ইখলাস বা একনিষ্ঠতার বরকত পাওয়ার তাওফিক দান করুন। দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণে নিজেদের মুখলিস বান্দা হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com