এই নারীর হাতেই তৈরি হয় জীবাণু ধ্বংসকারী ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজার’

প্রকাশিত: ১:৩২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

এই নারীর হাতেই তৈরি হয় জীবাণু ধ্বংসকারী ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজার’
লুপে হার্নান্দেজ (ছবি : সংগৃহীত)

 

অনলাইন ডেস্ক : করোনাকালে কিছু জিনিসের চাহিদা এবং ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য জিনিসটি হচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। সারাবিশ্বেই এর ব্যবহার, চাহিদা এবং বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই জরুরি এখন।

 

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বারবার সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে সব সময় তো আর হাতের কাছে সাবান পানি পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে সফল বিকল্প অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

 

তাও আবার হতে হবে ৬০ শতাংশের বেশি অ্যালকোহলযুক্ত। তবে জানেন কি, কে আবিষ্কার করেছিল এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার? কবে থেকেই বা আর কেনই এর ব্যবহার শুরু হলো? এসব নিয়েই থাকছে আজকের লেখা।

 

আজ করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে হয়তো প্রতিটি মানুষের হাতে স্যানিটাইজার রয়েছে। আপনি কি জানেন এই স্যানিটাইজার ৫৪ বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে? হ্যাঁ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রায় ৫৪ বছর আগে আবিষ্কার করেন এক নারী। এটি আবিষ্কার করেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার বেকারসফিল্ড শহরের এক বাসিন্দা, যার নাম লুপে হার্নান্দেজ।

 

১৯৬৬ সাল। লুপে হার্নান্দেজ ছিলেন নার্সিং এর ছাত্রী। রোগীর কাছে যাওয়ার আগে চিকিৎসক এবং নার্সদের বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হত। তাই তিনি ভেবেছিলেন যে, সব পরিস্থিতিতে পানি ও সাবান না পাওয়া গেলে কী হবে? রোগীর সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে চিকিৎসক এবং নার্সদের জন্য পানি ও সাবান ব্যবহারের পরিবর্তে অন্য কিছু ব্যবহার করার কথা চিন্তা মাথায় আনেন তিনি।

 

সেই চিন্তা থেকেই মাথায় আসে এমন কিছু তৈরি করতে হবে যাতে সাবান ও পানি ব্যবহার না করেই জীবাণুকে নষ্ট করা যায়। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশেষে তিনি অ্যালকোহলযুক্ত একটি জেল তৈরি করেছিলেন। এর গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য সেটি প্রথম নিজের হাতেই প্রয়োগ করেন তিনি। তার এই আবিষ্কার আজ এক গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুনাশক হিসেবে সবার কাছেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

 

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পর্যন্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে রুখে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। পানির মতো এটিকে শুকানোর কোনো দরকারই হয় না। সারা বিশ্বের কাছে লুপে হার্নান্দেজের এই আবিষ্কারটি তৎকালীন সময়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। তবে এর আগে প্রাচীন এবং মধ্যযুগেও জীবাণু ধ্বংসে ব্যবহার করা হত অ্যালকোহল।

 

প্রাচীন গ্রিসের গ্যালেন এবং ১৪তম শতাব্দীর ফ্রান্সের গাই ডি চৌলিয়াকের মতো বিখ্যাত প্রাথমিক ডাক্তাররা অ্যালকোহল সুপারিশ করেছিলেন। প্রাচীন মিশরীয়রা এটি চোখের সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতেন। যা ছিল খুবই বেদনাদায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি। অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে অ্যালকোহল ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক সমর্থন পায়নি। এরপর এল বুচল্টজ ইথানলের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ক্রিয়াকলাপটি পরীক্ষা করেন। তখন দেখা যায়, অ্যালকোহল জীবাণুগুলোর কোষ প্রাচীরকে দুর্বল করে দিয়ে নির্মূল করছে। এই প্রক্রিয়াটি পরবর্তীতে কোষের লিসিস হিসেবে পরিচিতি পায়।

 

১৮৮০ এর দশকে, অ্যালকোহল সাধারণত অপারেশন করার আগে ত্বককে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হত। এটি তখন স্বাস্থ্যসেবার প্রধানতম স্তরে পরিণত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের মধ্যে আমেরিকার ৬৪ শতাংশ হাসপাতাল ত্বকের জীবাণু ধ্বংসে ইথানল ব্যবহার করত। এই তথ্য পাওয়া যায়, সিমুর স্ট্যান্টন ব্লক সম্পাদিত জীবাণুনাশক, নির্বীজন এবং সংরক্ষণ বইতে।

 

তবে সেসময় এখনকার মতো হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছিল না। তখন একদম আসল অ্যালকোহল ব্যবহার করা হত। এতে হাতের জীবাণু ধ্বংস হলেও শুষ্ক হয়ে হাতের চামড়া শক্ত হয়ে যেত। এক দম্পতি তো এই অ্যালকোহল বিক্রি করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে তাদের ব্যবসা তুঙ্গে ওঠে। হাসপাতাল, স্কুল, বিমানবন্দর এবং আরো অনেক জায়গায় এর ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। অতঃপর সবার হাতের অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

এমনকি ওই দম্পতির কারখানার শ্রমিকরাও এই সমস্যায় ভুগছিলেন। তারাও কারখানা ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। অতঃপর অ্যালকোহল স্যানিটাইজার বাজারজাতকরণ বন্ধ হয়ে যায়।

 

তবে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ইতিহাসের জন্য একটি বড় মাইলফলক ১৯৮৮ সাল। যখন জিওজিও সংস্থা পিওরএল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারে আনেন। তবে এটি এখনকার মতো স্যানিটাইজার হিসেবে নয় বরং জীবাণুনাশক অ্যালকোহল হিসেবে প্রচার পায়। এটি কেবল হাসপাতাল, স্কুল এবং রেস্তোঁরা কর্মীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। নিজের বাড়ির জন্য বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেনা ছিল নিষিদ্ধ।

 

১৯৯৭ সাল থেকে পিওরএল জনগণের জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি শুরু করে। এক দশকের মধ্যে আমেরিকানরা প্রতি বছর প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছিল শুধু এই স্যানিটাইজারের জন্য। এটি সিএনএন-র একটি প্রতিবেদনে এমনই তথ্য জানানো হয়। একবিংশ শতাব্দীর পর এতে রং এবং সুগন্ধ মিশ্রিত করা হয়। বিভিন্ন আকারের প্যাকেট বা বোতলে প্যাকেজিং করা হয় স্যানিটাইজার। এতো ছোট আকারে প্যাকেজিং করা হয় যে, আপনি সহজেই পকেটে বা ব্যাগে রাখতে পারবেন।

 

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার বই অড্যাসিটি অব হোপ-এ লিখেছিলেন, ২০০৫ সালে তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় জর্জ ডাব্লু বুশের। যখন তিনি হোয়াইট হাউসে তার সঙ্গে দেখা করেন বুশ তাকে স্যানিটাইজারের সুবিধার কথা বলেছিলেন। তখন বারাক ওবামা বলেছিলেন, এটি সত্যিই ভালো জিনিস। আপনাকে সর্দি লাগা থেকে বাঁচাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com