একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এই রাজাকারের তালিকা প্রত্যাখ্যান করছি

প্রকাশিত: ২:২৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৯

একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এই রাজাকারের তালিকা প্রত্যাখ্যান করছি

কাজী নুসরাত শরমীন : এই স্বাধীন দেশটির জন্য ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। রক্তের বিনিময়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পেরিয়ে তবেই এই দেশটি আমাদের হয়েছে। এর পূর্ণ কৃতিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। তারা জীবনবাজি রেখেছেন। এই মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সাধীনতার ৪৮ বছরে আমরা তাদের ঋণ শোধ করতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারিনি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও অনেকেই হাড়ভাঙা খাটুনিতে জীবিকা নির্বাহ করেন। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা যখন রিকশা চালান, ভিক্ষা করেন….আমি ভিক্ষার থালা হতে আমার স্বদেশকে দেখতে পাই। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের পদ্মা সেতু হয়, মেট্রো রেল হয়, কিন্তু আমরা অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাস্তুসংস্থান করতে পারি না। কারণ হয়ত ওটা উন্নয়নের অংশ নয়।বড় লজ্জার কথা, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা আজকাল মরনোত্তর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করছেন।

 

আরও পড়ুন » রাজাকারের তালিকায় গোলাম আরিফ টিপুর নাম, হতবাক!

 

এবার টানা ১১ বছর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি ক্ষমতায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে। রাজাকারের তালিকা প্রকাশের ঘোষণায় আমরা আনন্দিত হয়েছি। এই তালিকা প্রকাশে বিজয় দিবস ছিলো একটি দারুণ উপলক্ষ। কিন্তু কার্যত আমরা কী দেখলাম? মুক্তিযুদ্ধে রক্তের নদী পার হওয়া একটি জাতি তার চিহ্নিত বেইমান রাজাকারদের তালিকা কিসের ভিত্তিতে প্রকাশ করলো ? সরকারকে অবহিত না করে কোন ক্ষমতাবলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কথিত পাকিস্তানিদের তৈরি করা তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ করলো? এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টরা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে কতটুকু ধারণা রাথেন? এই মন্ত্রী কি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নাম শোনেননি? এই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক, এ দেশের সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রমুখ, রাজশাহীতে দেশের প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুর নাম উঠে এসেছে রাজাকারের তালিকায়। এই মন্ত্রী যদি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হন, তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের নাম জানা কি তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে না? তাহলে কি তিনি দায়িত্বে অবহেলা করেছেন?

 

আরও পড়ুন » বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরের নাম ‘রাজাকার’ তালিকার ১ নম্বরে! হতবাক স্ত্রী

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন বরগুনা পাথরঘাটার মজিবুল হক নয়া। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকেছেন মজিবুল হক। মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাথরঘাটা সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের টানা ৪০ বছর সভাপতি ছিলেন তিনি, ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন।এই রাজাকারের তালিকায় তিনি এক নাম্বার রাজাকার! বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যিনি এক নাম্বার রাজাকার বানিয়েছেন, এই মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে রাজাকারের তালিকা তৈরিতে কী দায়িত্ব পালন করেছেন? এটা কি কর্তব্যে অবহেলা নয়?

 

বরিশালে অ্যাডভোকেট সুধির কুমার চক্রবর্ত্তীকে পাকিস্তানি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।যাকে পাকিস্তানি হায়েনারা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে, তাঁর সহধর্মিণী উষা রানী চক্রবর্ত্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নাম্বারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে! এটা কি তালিকা তৈরিতে মন্ত্রীর দায়িত্বে অবহেলা নয় ? অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী এখন মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাজাকারের তালিকার ৬৫ নম্বর রাজাকার! অ্যাডভোকেট সুধির কুমার চক্রবর্ত্তী গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।তাদের নাম রাজাকারের তালিকায় কি করে অন্তর্ভুক্ত হয়? মন্ত্রী এর কি জবাব দেবেন? এই দায়িত্বে অবহেলা ক্ষমার অযোগ্য। একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এই রাজাকারের তালিকা প্রত্যাখ্যান করছি, এবং কর্তব্যে অবহেলার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকের পদত্যাগ দাবি করছি।

 

লেখক : সাংবাদিক, কাজী নুসরাত শরমীন।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com