একবছরে কুলাউড়ায় যতো খুন-ধর্ষণ, আতঙ্ক

প্রকাশিত: ১:৪২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯

একবছরে কুলাউড়ায় যতো খুন-ধর্ষণ, আতঙ্ক

প্রতিকী

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার : জেলার কুলাউড়ায় চলতি বছরে রেকর্ডসংখ্যক খুন ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের সব বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করে চলতি বছরের মধ্যভাগে হঠাৎ করে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার মতো অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সচেতন মহলের দাবি সামাজিক অবক্ষয়ের অবনতিতে লোমহর্ষক এসব গণধর্ষণ ও খুনসহ অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

উপজেলায় এবারই প্রথম দুই স্কুল ছাত্রীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম, প্রবাসীর স্ত্রীকে বাড়িতে ঢুকে মারধর, এক শিশুকে অপহরণ ও এক গৃহপরিচারিকাকে গণধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। বছরজুড়ে এসব সহিংস ঘটনার অধিকাংশ শিকার শিশু ও নারীরা।

 

তবে এসব ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে কিছুটা স্বস্তি আসলেও হঠাৎ করে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শঙ্কা কাটেনি স্থানীয় সাধারণ মানুষের।

 

চলতি বছরে থানায় ৯টি হত্যা মামলা, একটি গণধর্ষণসহ ১৩টি ধর্ষণ মামলা এবং ১০টি ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানি মামলা দায়ের করা হয়। দুই স্কুল ছাত্রীকে বখাটে কর্তৃক কুপিয়ে জখম ও প্রবাসীর স্ত্রীকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় নারী শিশু নির্যাতনে মামলা ৩টি মামলা এবং ১টি শিশু অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও তিনটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এসব মৃত্যু নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও রহসজট সৃষ্টি হয়।

 

২৭ জানুয়ারি উপজেলার কর্মধার টাট্টিউলি গ্রামে ঘুমন্ত অবস্থায় মুসলিম উদ্দিন (৪০) নামে এক ব্যক্তি স্ত্রী রিমা বেগমের এলোপাতাড়ি দায়ের কোপে নিহত হন।

 

২৯ মে উপজেলার জয়চ-ী ইউনিয়নের গাজীপুর এলাকায় মসজিদের আম গাছ থেকে আম  পাড়তে বাধা দেওয়ায় প্রতিপক্ষের পিটুনিতে নিহত হন মন্তর মিয়া (৭০) নামে এক বৃদ্ধ।

 

১৭ এপ্রিলে উপজেলার সদর ইউনিয়নের গুতগুতি গ্রামে জমিজমা বিরোধের জেরে চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের সাথে সংঘর্ষে দিলু মিয়া (৩৫) নামে দুই সন্তানের জনক মারা যান।

 

২১ আগস্ট উপজেলার ভূকশিমইলের সাদিপুর গ্রামে নদীতে দারাজাল  (খেউ) ইজারার জেরে মামা-ভাগ্নের ঝগড়ার সময় ছুরিকাঘাতে মাদ্রসাছাত্র অনিক মিয়া (১০) খুন হয়।

 

২৭ এপ্রিল উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে নোয়াগাঁও গ্রামে শশুড়বাড়ির লোকজন কর্তৃক নির্যাতনে ফাহিমা আক্তার (২২) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন তাঁরই পিতা আবুল কালাম।

 

৩১ জুলাই কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের বালিশ্রী গ্রামের পরিমল শব্দকরের ছেলে পলাশ শব্দকর (৯) নামে এক স্কুলছাত্রকে বলাৎকারের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

 

১১ আগস্ট উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের হোসনাবাদ গ্রামে আপন বড় ভাই মামুনুর রশীদ মামুন ঘরে ঢুকে ছোট ভাই রাজিবুল ইসলাম রাজুকে (১৭) ভোরে ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

 

৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে কিশোর সুলেমানকে (১৩) নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্য করা হয়। ১৫ অক্টোবর কর্মধার বিরোধপূর্ণ লম্বাছড়া পুঞ্জির পাহারাদার ইসমত আহমদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ওই পুঞ্জির গারো সম্প্রদায়ের লোক।

 

বছরজুড়ে আলোচিত যত হত্যাকান্ড ও ঘটনা
৩১ জুলাই কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের বালিশ্রী গ্রামের পরিমল শব্দকরের ছেলে পলাশ শব্দকর (৯) নামে এক স্কুলছাত্রকে বলাৎকারের পর নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারই দুই প্রতিবেশী কিশোর জাহেদ ও রাহেল। এ ঘটনায় জড়িত জাহেদ ও রাহেলকে আটক করে জিঞ্জাসাবাদ করে তাদের স্বীকারোক্তির তথ্যমতে পরদিন কালিটি চা বাগানের একটি জঙ্গল থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পলাশের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের কিশোর সুলেমান (১৩) কে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ঘরের খুঁটিতে রশি দিয়ে হাত বেঁধে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে একই গ্রামের আনু মিয়ার ছেলে রেদোয়ান মিয়া ও তার পরিবারের লোকজন। জানা যায়, রেদোওয়ানের ছোট বোনের সাথে সুলেমানের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। ঘটনার সাথে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

 

এদিকে চলতি বছরে কুলাউড়ায় আলোচিত গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১৫ এপ্রিল রাতে প্রেমিকের সাথে ঘুরতে গিয়ে ৭ যুবক কর্তৃক গণধর্ষণের শিকার হন ১৭ বছর বয়সী এক গৃহপরিচারিকা। উপজেলার আছুরীঘাটে এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসময় মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে ধর্ষণকারীরা এবং ধর্ষণের ঘটানা প্রকাশ করলে ভিডিও প্রকাশের হুমকি প্রদান করে। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনার সাথে জড়িত ধর্ষকদের আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। এছাড়াও বছর জুড়ে আরো ১২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসব ধর্ষণের শিকার হোন শিশুরাও।

 

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সামিরা আক্তার (১৫) নামে স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ২৭ এপ্রিল কুলাউড়া-ঘাটের বাজার সড়কের মীরশংকর এলাকায় প্রকাশ্যে দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে জুয়েল আহমদ (২০) নামের এক যুবক।

 

৩০ জুন উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নে পারিবারিক বিরোধের কারণে বখাটে রহুল আমীন কর্তৃক হাজেরা বেগম (১৪) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে রুহল আমীনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ। এক সপ্তাহ পর সেই জামিনে মুক্ত হয়ে এসে রুহুল ও তাঁর পরিবারের লোকজনদের নিয়ে ওই ছাত্রীর মাকে মারধর করে এবং মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়। এতে ভয়ে মাসখানেক ধরে ঘরছাড়া থাকে ওই ছাত্রীসহ তার মা বাবা। পরে কুলাউড়া থানা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁদেরকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

 

৩১ মে রাত ৮টার দিকে পৌরশহরের থানা রোডস্থ মাহাদী অমি (৯) নামে এক ৪র্থ শ্রেণির স্কুল শিক্ষার্থীকে প্রতিবেশী রেদওয়ানসহ কয়েকজন যুবক মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে। ৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন ভোরে শ্রীমঙ্গল থেকে অপহরণকারীসহ অমিকে উদ্ধার করে পুলিশ।

 

এছাড়াও উপজেলার সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার বেশি বেড়েছে। থানায় ৬৫টি মাদক মামলা হয়েছে।

 

এসব প্রবণতা কেন বৃদ্ধি পায় সে প্রসঙ্গে কুলাউড়ার লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, বর্তমান আধুনিক যুগে অধিকাংশ মানুষ সুস্থ বিনোদন, জ্ঞান চর্চা এবং খেলাধুলা ছেড়ে ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতি নির্ভর হয়ে পড়েছে। মানুষ স্বভাবজাত সামজিক জীব। সমাজে যদি অস্থিরতা ও অবক্ষয় বিরাজ করে তাহলে মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে এবং এর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে মানুষ সৃষ্ট অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

 

এ বিষয়ে কুলাউড়া ইয়াকূব-তাজুল মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. রজত কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক জীবনের শিক্ষা তথা অপরিমিত সামাজীকিরণ- পারিবারিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ মানুষকে ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন করছে বিভিন্নভাবে- যা তরুণকে পর্যুদস্থ করার প্রেক্ষিতে ইয়াবা সেবন। জীবনকে অস্বীকার করে চলার প্রচেষ্টা মানুষকে মানবিক গুণাবলী থেকেও বিচ্ছিন্ন করছে- বিকৃত হচ্ছে মূল্যবোধ। খুন, ধর্ষণ, হত্যাসহ অনৈতিক কর্মকান্ডের মূখ্য কারণ হচ্ছে এই বিকৃতি। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি এ ব্যবস্থার আক্রমণে আহত- এ অবস্থায় সুস্থ সংস্কৃতি বহনকারী পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষাই একমাত্র অবলম্বন, যা থেকে জন্ম নেবে মানবতা, যা কিনা বিচ্ছিন্নতা রোধ করতে পারে। ইন্টারনেট, ইউটিউব,ফেসবুক সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সত্ত্বাবিহীন অন্ধ প্রতিবাদ সৃষ্টি করে- একমাত্র রাষ্ট্রই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে- শুধু ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি দিয়ে ইহা সম্ভব নয়।

 

কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়ারদৌস হাসান বলেন, কুলাউড়ার আইনশৃঙ্খলা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সবসময় তৎপর ছিল এবং আছে। আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় কুলাউড়ায় অনেক কম পুলিশ সদস্য রয়েছে। আরো কিছু জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ালে মানুষের দ্বারপ্রান্তে বেশি আইনী সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com