গ্রাম্য কুসংস্কার একটি ব্যাধি (শেষাংশ)

প্রকাশিত: ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০১৮

গ্রাম্য কুসংস্কার একটি ব্যাধি (শেষাংশ)

বসতে হল সারির মাধ্যমে পীরের সাক্ষাৎ পেতে। তাই করলাম। ইত্যবসরে পীর সাহেবের পিতা আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেন পান, সুপারী ও সিগারেট পরিবেশনের মাধ্যমে। আমরা তা সানন্দে গ্রহণ করলাম। যেহেতু আশেপাশে কোন দোকান ছিল না বলে পান সুপারী থেকে বঞ্চিত ছিলাম অনেকক্ষণ যাবত। এক সময় পীরের সাহচর্য পেতে সক্ষম হলাম।

পীর সাহেব আমাকে বললেন, আমার মাথা ঘুরায়, শারীরিক দূর্বলতা ইত্যাদি। কিন্তু আমি যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম তার ধারে কাছে ও যেতে সক্ষম হন নাই। তথাপি পীর সাহেব আমার হাতে একটি তাবিজ ধরে দিলেন যা পূর্ব থেকে লিখিত অনেকগুলির মধ্যে একটি। অপর সঙ্গিদ্বয় এমতাবস্তায় বিফল হয়ে ফিরে আসলেন। বাহিরে এসে পথ চলতে চলতে তাবিজ খুলে দেখলাম হ-য-ব-র-ল কিছু আরবী লিখা। দিনটা খসে পড়ল জীবন চলার পথ থেকে বিস্মৃতির পথে। সাথে অর্থনৈতিক ও শারিরিক পরিশ্রম। রাতে পায়ের ব্যথায় ঘুম হল হারাম। পীর সাহেবদের এ হল কেরামতি। কিন্তু আমি অর্জন করলাম এ বিরাট তথ্য ও তত্ত্ব। মেয়েরা মায়ের জাত। আবার একটা প্রবাদসম “তাদের অন্তর অত্যন্ত কোমল।” তথাপি মানুষের মন বড়ই সন্দেহ প্রবণ। কথায় আছে “সন্দেহ প্রবণ মন, আঁধার ঘুচে না কখন।” সন্দেহ নামক বস্তুটি যার অন্তরে একবার স্থান লাভ করেছে তা থেকে পরিত্রাণ প্রাপ্তি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

পীর সাহেবরা (প্রকৃত আলীম ব্যতীত) সহজ সরল মেয়েদের মধ্যে একটি সন্দেহের বীজ বপন বা রোপণ করে অনেক সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দেন। যে আগুনে পুড়ে সোনার সংসার ধবংস হয় তার হিসেব আমরা রাখি না। অনেকটা থেকে যায় অজ্ঞাতে। যেমন স্ত্রী গেলেন রোগ সারাতে পীর সাহেব বলে দিলেন আপনার স্বামী একটি বাড়িতে যান ঘন ঘন। দ্বিতীয় বিয়ে করার সম্ভাবনা। অথবা একটি মেয়ে আপনার স্বামীর প্রতি আগ্রহী। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়ত স্বামী প্রবল ঘুণাক্ষরে ও এ জাতীয় কাজের থেকে অনেক দুরের বাসিন্দা। কিন্তু স্ত্রী এ জাতীয় কথাকে সঠিক ও বিশ্বাস করে শুরু করলেন দৌড় বিভিন্ন রুপে। কারন কোন স্ত্রীই চায় না স্বামীর অংশে ভাগ দিতে বা বসাতে।

সুতরাং স্ত্রী ঐ বাড়ির প্রতি, সংসারের প্রতি, লোকের প্রতি সর্বোপরি স্বামীর প্রতি সন্দেহ প্রবণতার মাধ্যমে সাংসারিক সব কিছু তুচছ করে গুরুত্ব দিলেন ধ্যাণ ধারণায়, চিন্তা চেতনায় উল্লেখিত ব্যাপারটিকে। কেমন করে স্বামীকে বশে আনা বা রাখা যায়। শুরু হল এখানে ওখানে যাতায়াত। অনেকটা জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্বামীর। এতে একদিকে অর্থ ব্যয়, অপরদিকে সংসারের প্রতি একটা উদাসীনতা। মনে সর্বক্ষণ স্বামীকে বশে আনা বা রাখা। আমি এসন ও প্রত্যক্ষ করেছি এ ধরণের অনেকক্ষেত্রে স্বামীর প্রতি সরাসরি বাক্য ছুড়ে দেয় স্ত্রী, আপনি এখানে ওখানে যান? এ থেকে শুরু হয় দ্বিধা, দ্বন্ধ। এমন কি বিচেছদ পর্যন্ত গড়ায়।

অপরদিকে পীর সাহেব পথ্য দানের মাধ্যমে তিনি হচেছন চর্বিদার। বৃদ্ধি হচেছ মোটা, তাজা। খেলাটা শুরু না করলে তিনির কাছে লোক যাতায়াত হবে না, অর্জিত হয় না তিনির টাকা রোজগারের ব্যবস্তা। এ প্রকৃতির অনেক পীর সাহেবকে প্রত্যক্ষ করেছি দু’চার বৎসর পীর হয়ে পরবর্তীতে অন্য পেশার মাধ্যমে জীবিকার্জন করতে। পীর যদি সত্যিই পীর হয়ে থাকেন তবে কেন পেশার পরিবর্তন? দীর্ঘ দিন কেন থাকে না পীরের কেরামতি? অর্থ্যাৎ যে ক’দিন মানুষকে প্রতারণা করা যায় ততদিন পীর এবং রোগিরা যখন প্রতারণা বুঝে ফেলে তখনই চলে যায় পীরালী। কিন্তু এ অল্প দিন পীর ব্যবসার মাধ্যমে অনেক অনেক সংসারে আগুন জ্বালিয়ে তিনি হন ক্ষান্ত। এ আগুন জ্বলে কিন্তু অনির্বাণ লোক চক্ষুর অন্তরালে, অলক্ষ্যে দিনের পর দিন, চিরদিন।

অপরদিকে শুধু পীর সাহেবকে দোষ দিয়ে লাভ কি? আমি, আমরা না গেলে বিশ্বাস না করলে, পীর কি করে আমাকে নিয়ে যাবে? সব নষ্টের মুল আমরাই। আমরা বিশ্বাস করি বলেই পীর সাহেব ধোঁকা দেবার প্রয়াস পান, ধোঁকায় তৃপ্ত হন, তার কাংখিত লক্ষ্য অর্জিত হয়। (সব নয়) মহিলা শ্রেণী এ পক্ষের বেশী অনুসারী। তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বুঝাতে হবে। বুঝাতে সক্ষম হলে অবশ্যই একটি সুফল বয়ে আসবে, পাবো এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এক লোক সুদীর্ঘ ১৪ বৎসর প্রবাস জীবস কাটায় স্ত্রী সন্তান তথা পরিবারের সুখ স্বাচছন্দ্যের নিমিত্তে। আমি লক্ষ্য করেছি ঐ লোকটি না খেয়ে না পরে টাকা পয়সা পাঠিয়ে দিত স্ত্রী সন্তানের জন্য। তার কথা ছিল যদি আমি না খেয়ে না পরে স্ত্রী সন্তানকে ভাল ও উন্নত বস্ত্র পরিহিত করাতে পারি এটাই সুন্দও ও সার্থক। কিন্তু জানি না কোন অপরাধে স্ত্রী স্বামীকে এ জাতীয় কার্য্যরে মাধ্যমে প্রবাস ছাড়া, সংসার ছাড়া, সন্তান থাকাবস্তায় সন্তানবিহীন অবস্তায় দিনাতিবাহিত করছে। সোনার সংসারটা তছনছ করে লোকটি বিপর্যস্থ অবস্তায় বিচেছদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। তারপর ও স্বামী ছিল উদগ্রীব স্ত্রী যদি ভুল বুঝতে পারে বা আসার দৃঢ়তা প্রকাশ করে, তবে একটি পথের সন্ধান বা সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে স্বামী তার চাচাত ভাই, ভাতিজা সঙ্গে নিয়েছে যে কারো সঙ্গ ধরে আসার উপলক্ষ্য মনে করে যদি ইচছুক হয়। এখানে স্ত্রী কোন সুযোগ নেয়নি। বরং তারই ( স্ত্রী) সম্মুখে তার পিতা, ভাই উদ্ধত আচরণ প্রদর্শন, এমন কি হুমকি প্রদান করে। তারপর ও স্বামী হাল ছাড়ে নাই। সে ( স্বামী ) ভেবেছে হয়ত অন্য কোন পন্থায়, সুযোগে স্বামীকে একা পেয়ে সুযোগ নিতে চায়। একা সম্মুখস্ত হয়েছে। চেয়েছে টাকা। যে আসবে না তাকে আনার কথা বলা বা প্রচেষ্টা হবে নির্যাতন তুল্য ভেবে তৎক্ষণাৎ টাকা প্রদানে সম্মতি এবং টাকা যথারীতি প্রদেয়।

মোশাররফ হোসেন বিষাদ সিন্ধুতে সীমারের কার্যকলাপে যথার্থ বলছিলেন, “অর্থ! রে পাথকী অর্থ! তুই সকল অনর্থের মুল”। এ জগতে যে যে বা যারা সীমারসম পাষন্ড হয়ে টাকাকে অধিক গুরুত্ব দেয়, ওরা কি চায়সহজেই বিজ্ঞজনের অনুধাবন যোগ্যতায় ধরা পড়ে, পড়বে। তা পাঠকের উপর ন্যস্ত। এখানে ও কথা ছিল না যদি পরবর্তীতে আসার ইচছা ব্যক্ত না হত। “সময়ের একৃ.অসময়ের দশফোঁড়” এরম ত স্বামী প্রবর ততদিনে বিয়ে করে সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবার যাত্রায় সামিল। স্বগোক্তি স্বরুপ উচচারিত হয়, “এখন কেন কান্দ গো রাই, আগে কি মনে ছিল না।” গ্রামে সন্তান জন্মের পর মায়েরা আজো জাল বা বিভিন্ন লতাপাতার অংশ বিশেষ ইত্যাদি আতুড় গৃহে বা রুমে লটকিয়ে রাখেন, রুমটি বন্ধ রাখার পক্ষপাতি। জালের টুকরো রাখেন লটকিয়ে জিন বা শয়তানের আছর থেকে পরিত্রাণের আশায়। আগুন জ্বালানো হয় প্রত্যেক দরজায় শয়তান নাকি আগুনকে ভয় পায়। বাচচাকে অনেক দিন বের করতেন না রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপলক্ষ্য মনে করে। অনেক মাকে বুঝানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার শাল দুধ শিশুকে খাওয়াতে। তাদের অভিমত শাল দুধ শিশুর জন্য বিষ সদৃশ।

তবে আশার কথা হলো বর্তমানে অনেকটা দুরীভুত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে। গ্রামের অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষের অনেকের মধ্যে এ ধরণের শত শত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বিরাজমান। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ সমস্ত কুসংস্কার বিশ্বাস করে মিথ্যা ও ক্ষতিকর অনেক রুসুম বা রেওয়াজকে বাধ্যতামুলক পালন করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে সমাজকে প্রগতির পথকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে মারাত্মক বিঘ্নের সহায়ক। সঠিক ও পূর্ণ ইসলামী আকিদার অভাবে সমাজ সংসারকে সঠিক দিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চনার ফলে একটি সুন্দর, সুস্থ জীবনকে ধবংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সুতরাং এ ব্যাধি আক্রান্ত সমাজকে নিরক্ষরতার মতো অভিশাপ থেকে রক্ষা কল্পে রেড়িও, টিভি এমন কি পাঠ্য পুস্তকে প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করে অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত জরুরী। ইসলামী আকিদার পূর্ণ প্রচার ও প্রসারতা কাম্য নিরন্তর।

লেখক মিজানুর রহমান মিজান, প্রতিষ্টাতা ও পরিচালক চানঁ মিয়া স্মৃতি পাঠাগার, সাবেক সভাপতি বিশ্বনাথ প্রেসকাব, বিশ্বনাথ, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com