গ্রাম্য কুসংস্কার একটি ব্যাধি (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০১৮

গ্রাম্য কুসংস্কার একটি ব্যাধি (প্রথম পর্ব)

গ্রাম প্রধান বাংলাদেশ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আজও অনেক ক্ষেত্রে অসচেতন। তাছাড়া শিক্ষিতের হার কোন কোন ক্ষেত্রে যদি ও বলা হয়ে থাকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাপি প্রকৃত শিক্ষার হার আনুপাতিক হারে কম বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত মাত্রই সুশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত। এ শ্রেণীর আনুপাতিক হার এর কথা বলছি। সরকার ছাত্রীদের বেতন মওকুফসহ উপবৃত্তি চালু করে সত্যিই একটি প্রশংসনীয় ও গর্বিত উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে গ্রামের স্কুলগুলিতে ছাত্রী সংখ্যা উল্লেখজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। কারন অনেক অভিভাবক কিছু দিন পূর্বেও মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বিভিন্ন কারনে অভিশাপ মনে করতেন।

কিন্তু এখন উপবৃত্তিসহ বেতন মওকুফের ফলে স্কুলে পাঠাতে বা শিক্ষা লাভে আগ্রহী। শিক্ষাক্ষেত্রে এটা উল্লেখযোগ্য বা আশানুরুপ ফল প্রাপ্তির একটা অংশ। তথাপি দেশের শিক্ষার্থীর একটা বিরাট অংশ প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিপর্যয়ে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়া অংশ বা অল্প শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কুসংস্কার বাসা বেঁধে আছে গ্রামাঞ্চলে। গ্রামের মানুষের মধ্যে অসংখ্য সমস্যা বিদ্যমান। তার অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে কুসংস্কার।

গ্রামের কুসংস্কারগুলো মেয়েদের মধ্যে বহুল পরিমাণে বিরাজমান। কুসংস্কারকে ওরা ধর্মীয় ফরজ কাজের মত আকঁড়ে ধরে। ফলে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়। গ্রামে এক সময় কঠোর নিয়ম চালু ছিল সোমবারে মেয়েরা বাপের বাড়ি হতে স্বামীর বাড়ি আসবে না। মেয়ের মা এক্ষেত্রে সাধারণত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেই। এ যে কুসংস্কার তা বুঝানো যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করবে। এমন ও রুপ ধারণ করে যা বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াবে। কিন্তু পরিশেষে এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হবে।

পূর্ব পুরুষরা এ কাজে উৎসাহিত করেছেন। তা পালনে অদ্যাবধি অভ্যস্থ অনেক পরিবার। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যতই বুঝাবার চেষ্টা করবে, ততই বিপদ ও ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হবে। তবে আশার কথা বর্তমানে অনেকটা দুরীভুত হয়েছে। কয়েক বৎসর পূর্বে ও গ্রামাঞ্চলে চৈত্রের শেষে গুরুতর রোগ মুক্তি উপলক্ষ্যে এক প্রকার “রুট ” নামক রুটি তৈরী করে বন্টন করা হত। রুটিটি ছিল অত্যন্ত মজাদার ও ব্যয়বহুল। এটা ছিল গৃহস্থের গরুর পরিমাণের উপর নির্ভরশীল। গৃহস্থের যে কয়টা গরু ছিল ছোট বড় ততটা রুটি তৈরী হত। এ রুটি তৈরী করতে উক্ত সময় গ্রামময় হিড়িক পড়ে যেত। প্রতিদিন একাধিক পরিবারে রুটি তৈরী হত। গ্রামের যুব সম্প্রদায় এ কাজে ব্যস্ত থাকতেন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। মুরবিবয়ানরা দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। খেতে ও অনেক সুস্বাদু ছিল।

কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে গরুর সংখ্যা পূর্ব থেকে অনেক কমে গিয়াছে এবং অনেক পরিবারে গরু থাকলে ও আজ আর রুট নামক রুটি তৈরী মোটেই হয় না। রুটের কথা মানুষ ভুলেই গেছে।

বয়স্কদের মুখ থেকে অনেক সময় শুনা আক্ষেপের সুরে, “বহুদিন হয় উহার স্বাদ থেকে বঞ্চিতের কথা।” ছোট শিশুর দাঁত পর্যায়ক্রমে পতিত হয়ে আবার নূতন দাঁত গজায়। পড়ন্ত দাঁত কাক দেখলে নুতন দাঁত উঠবে না এ বিশ্বাস অনেকের মধ্যে বিদ্যমান। পোঁকায় খাওয়া আম খেলে শিশুরা সহজে সাতাঁর শিখতে পারবে, পারা যায়। সুতরাং শিশুকে পোঁকায় খাওয়া আম খেতে প্রতিযোগিতায় নামানো হয়। কোথাও যাত্রাকালে পিছন থেকে ডাকা অমঙ্গল। জরুরী কিছু ফেলে গেলে ও অমঙ্গলের লক্ষণ। কথা হল জরুরী, এমন কি যে কার্যোপলক্ষ্যে যাত্রা শুরু সে জিনিষ ফেলে গেলে ভুল বশত; ফিরে এসে নেয়াটা অমঙ্গলের লক্ষণ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে যুক্তি কতটুকু তা ভেবে কুল কিনারা পাই না। আমি এক দিন ভীষণ বিপদে পড়ে যাই পথিমধ্যে এক লোকের অদ্ভুত আচরণে। তার কথা হল ওর ডান পাশ দিয়ে কেহ যেতে পারবে না। জানিনা তিনি কতটুকু জীবন চলার পথে এ নিয়ম মেনে চলতে পারেন। অনেক আছেন কোথাও যাত্রাকালে গৃহের দরজাকে সালাম দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে নাকি গৃহে নিরাপদে ফিরে আসার অভয় বার্তার একটি সুলক্ষণ বা নিশ্চয়তার অনেক গ্রান্টি। চলার পথে সকল বিপদ আপদ থেকে মুক্তির পূর্ণ অবলম্বন।

যাত্রাকালে শুন্য কলসী দর্শন অমঙ্গল আশঙ্কা। এক্ষেত্রে অনেকে অনেক প্রকার অশালীন উক্তি বা আচরন করে থাকেন। রাত্রিকালে ঘর থেকে অনেকে টাকাপয়সা লেনদেন করেন না , লক্ষী চলে যাবার ভয়ে বা অজুহাতে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে জীবনের কি এ নিয়ম যথাযথ পালনের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারেন এটাই আমার জিজ্ঞাস্য? রবি ও বৃহৎস্পতিবার বাঁশ কাটতে মানা। সন্ধ্যার পর ঝাডু দিয়ে আবর্জনা বাহিরে ফেলতে নেই। রাত্রি বেলা আয়নায় মুখ দর্শন নিষিদ্ধ। গৃহস্থ খাবার গ্রহণ কালে ভিক্ষুক দরজায় দাড়িয়ে ভিক্ষা চাইলে দিতে মানা। ছোট বড় কেহ যদি কঠিন অসুখে ভোগে দীর্ঘদিন তবে রোগির রোগমুক্তি হবে কি না , তা জানার উদগ্র আগ্রহ নিয়ে সন্ধ্যার পর তিনজন মহিলা (একজন বিধবা, একজন বিবাহিত, একজন অবিবাহিত মহিলা) তিন রাস্তার সংযোগ স্থলে আড়ালে দাড়িয়ে ঠিকবাজি বা আলামত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে নিরবে কিছুক্ষণ বসে থাকেন।ঐ সময় ঐ রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারি লোকদের কথাবার্তা থেকে ঠিকবাজরা ধারণা পেয়ে থাকেন রোগির রোগ সম্পর্কে। আমি ১৯৯৭ সাল থেকে উভয় পায়ের হাটুঁর জয়েন্টে মারাত্মক ও ভীষণ যন্ত্রণায় কাতর। এ রোগ আমাকে যে কষ্ট ও জ্বালা দিচেছ তা একমাত্র আল্লাহ ও আমি ছাড়া কেহ অনুধাবন করতে পারবে না। বুঝতে পারবে যদি আমার মত এ জাতীয় রোগে কেহ আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অনেক ডাক্তার , ঔষধ পত্র ব্যবহার করে কোনো ফলাফল প্রাপ্তি হচেছ না বিধায় আমার মা, স্ত্রী অস্থির একটিবার পীর ফকিরের নিকট যেতে। কিন্তু আমার কোন সময়ই পীর ফকিরের (প্রকৃত আলীম ব্যতীত) নিকট যেতে বা ওরা কিছু করতে পারবে বলে বিশ্বাস নেই। তবু ও শেষ পর্যন্ত মায়ের পীড়াপীড়িতে এক দিন রওয়ানা হলাম এক মহিলা পীরানীর নিকট। তিনি নাকি রোগির সব কিছু বলে দিতে পারেন। এমন কি বলে দেন হিসেবে অনেক লোকের যাতায়াত তথায় হয়। মহিলার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম সকাল দশটায়। পেয়ে গেলাম সেখানে আমার মত দু’জন পুরুষ রোগি। আর বাকি সাতজন রোগি সবাই মহিলা। রোগির পরিমাণ কমপক্ষে ধীরে ধীরে বর্ধিত হয়ে ২৫/৩০ জনে উন্নীত হল। ধারাবাহিকতায় পীরানী প্রথম কিস্তি দশজন রোগির আর্জি নিয়ে ( তাদের ভাষায় ) মোরাকাবায় বসলেন। একেক করে বলতে লাগলেন প্রত্যেকের মনের অভিলাষ। আর রোগিরা বলতে লাগলেন ঠিক ঠিকই পীরানী বলে যাচেছন তাদের হৃদয়ের কথা, মনের অভিব্যক্তি। সবাইকে তাবিজ কবজ দিলেন নিলেন তার বিনিময়ে টাকা পয়সা যার যার রোগ বুঝে পথ্যের মত। দ্বিতীয় দফায় প্রথম ক্রমিকে আমি তারপর অপর দু’পুরুষ এর সর্বশেষে নিলেন আর সাতজন মহিলা রোগির আর্জি। বসলেন মোরাকাবায়। ডাক পড়ল আমার। তিনি বলে যাচ্ছেন আমার মাথা ঘুরে, বুকে পিঠে বেদনা, কোমর বেদনা ইত্যাদি। কিন্তু একটিবার ও বললেন না আমার হাঠুর অসুবিধা বা রোগের কথা। কারন হল আমাকে দেখতে সুস্থ অনুভুত হয়। কিন্তু আমি হাঠু মোটেই ভাঁজ করতে পারি না। চেয়ার ব্যতীত বসতে পারি না। দেখতে পারছেন না বা আমি পূর্বে কিছুই বলিনি বিধায় বলা সম্ভব হচেছ না। আমি জবাব দিলাম আমার রোগের বা উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য হচেছ না। তিনি জবাব দিলেন বুঝতে পারছি না আপনার সব কিছু আমি ঝাপসা দেখছি। যাহোক আমাকে বাদ দিয়ে ক্রমান্বয়ে পরবর্তী পুরুষদের বেলা ও একই রুপ।

অর্থ্যাৎ ওরা জবাব দিলেন তাদের রোগের বা উদ্দেশ্যের সাথে মিল হচেছ না। অত:পর ঐ দু’ব্যক্তির বেলা ও বলা হল আপনাদের সব কিছু অন্ধকার দেখছি। তবে পরবর্তী রোগিদের সব কিছু তিনি বলে দিলেন এবং রোগিরা ঠিক ঠিক বলে চলেছেন। শেষ মুহুর্তে আমরা পুরুষদের বলা জবাব হল জানি না আপনাদের ভাগ্য মন্দ না তিনির (পীরানীর) ভাগ্য মন্দ।

যাহোক অন্য একদিন আপনারা আসুন দেখা যাবে। কি আর করা বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসলাম। তবে এখানে যা লক্ষণীয় তাহলো মহিলাদের বেলা কিছু কমন কথা বললেই তাদের মনের কথার সাথে মিলে যায়। যেমন “আপনার খন্নির দোষ, চালানের মুখে পড়েছেন, মাথা ঘুরায়, তলপেঠে বেদনা, একটি মহিলা আপনার স্বামীর প্রতি আগ্রহী, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করার বাসনা ইত্যাদি।

অপরদিকে মহিলারা পীরানীর নিকটে গিয়েই শুরু করেন বলাবলি কি উপলক্ষ্যে গমণ অথবা অপর মহিলার সাথে আলাপ জুড়ে দেন, আমি এসেছি বোন আমার মেয়ের বিবাহের অনেক আলাপ আসে কিন্তু ফিরে যায়, আমার স্বামী সর্বদা অন্যমনস্ক থাকেন, স্বামী সংসারের প্রতি উদাসীন ইত্যাদি। রোগি মেয়েদের মুখ থেকেই পীরানী পেয়ে যান আগমণের হেতু বা কার্যকারন।

সুতরাং রোগ সম্পর্কে বলতে পীরের কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মহিলার বাড়ি থেকে বের হয়ে খবর পেলাম উক্ত গ্রামে আরেকজন নব্য ছেলে পীর হয়েছে মাস খানেক হবে। আমরা তিনজন পুরুষ পরামর্শ করে ঐ সময়ই রওয়ানা হলাম পীরের বাড়ি অভিমুখে। সেখানে ও লক্ষ্য করলাম মহিলাদের সংখ্যাধিক্যতার। অর্থ্যাৎ পুরুষ রোগি নেই বললেই চলে। বেশ কিছু সময়। (চলবে)

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com