প্রচ্ছদ

জাফলংয়ে বনের জমি নিজেদের দাবি করছে ‘মোহাজের’রা

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:১৪

সুরমা মেইল ডেস্ক

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না বনের জমি দখল। সম্প্রতি মোহাজের দাবিকারী একটি গোষ্ঠী দখল করছে বনের জমি। অব্যাহত দখলের ফলে ইতোমধ্যে বনবিভাগের প্রায় ৪০ শতাংশ জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রশাসনের নির্লিপ্ততায়ই দখলদাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে বলে অভিযোগ পরিবেশকর্মীদের।  ভুমি দখলের মুলহোতা হলেন তামাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. মানিক মিয়া।

জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে অনেকে আশ্রয় নেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে। এই উদ্বাস্তুরা ‘মোহাজের’ নামে পরিচিত। জাফলংয়ে বনের জমি অধিগ্রহণ করে এদের থাকার ব্যবস্থা করে তৎকালীন ত্রাণ অধিদপ্তর। এরপর ১৯৮৫ সালের গেজেটে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধিগ্রহণ করা জমিগুলো বন বিভাগকে ফিরিয়ে দিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই এলাকায় বন বিভাগ গড়ে তুলে গ্রিন ফরেস্ট। সর্বশেষ এসএ রেকর্ডেও এই ভূমি বন বিভাগের নামে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগের জমি নিজেদের বলে দাবি করেছে ‘মোহাজের’ পরিচয়দানকারী একটি গোষ্ঠী। জমি পেতে আদালতে মামলা করেছে তারা। তবে আইনি প্রতিকারের জন্য অপেক্ষায় না থেকে বনের জমি দখল করে নিচ্ছে এই গোষ্ঠী। গত এক বছরে এই গোষ্ঠী বনবিভাগের প্রায় পাঁচশ’ একর জমি দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)’র সিলেটের সমন্বয়কারী এডভোকেট শাহ শাহিদা আকতার বলেন, যারা দখল হওয়া জমি উদ্ধার করার কথা তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই দখলদারদাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন জায়গা দখল করছে।

সিলেটের জেলার মধ্যে বন বিভাগের জমি সবচেয়ে বেশি গোয়াইনঘাট উপজেলায়। জমি বেদখল হওয়ার প্রবণতাও বেশি এখানে। পর্যটন সমৃদ্ধ এই উপজেলার প্রকৃতিকন্যা খ্যাত পর্যটনকেন্দ্র জাফলংয়ের পাশেই তামাবিল স্থলবন্দর। এই স্থলবন্দরে নেই পণ্য মজুদের পর্যাপ্ত সুবিধা। ফলে স্থলবন্দর নিয়ে আমদানিকৃত কয়লা-পাথর মজুদের জন্যে দীর্ঘদিন ধরেই বনের জমি দখল করে ডাম্পিং ইয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করে আসছে একটি গোষ্ঠী। বনের জমিতে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য পাথর ভাঙ্গার কল (স্টোন ক্রাশার মেশিন)। মোহাজেরদের নামে সাম্প্রতিক তৎপরতা জাফলংয়ে বনের জমি দখলে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কাগজে কলমে গোয়াইনঘাট উপজেলায় বনবিভাগের ২২ হাজার ২০৭ একর জায়গা রয়েছে। এরমধ্যে জাফলং বিটের সর্বমোট ভূমির আয়তন ৬ হাজার ৮শ’ ৭১ একর। যার ৫৩৭ একর জায়গায় ছিলো সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ২০০৭ সালে টিলাশ্রেণির এই ভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল গ্রিনপার্ক। তবে সংরক্ষিত এই বনের ২৩৭ একর জায়গা আগেই বেদখল হয়ে গেছে। এবার আবার নতুন করে শুরু হয়েছে বনের জমি দখল। গত এক বছরেই বনের প্রায় পাঁচশ’ একর জায়গা দখলে নিয়েছেন মোহাজের দাবিদার একটি গোষ্ঠী। দখলকৃত জমির বন ধ্বংস করে তারা ডাম্পিং ইয়ার্ড হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে। অব্যাহতভাবে দখলের ফলে গত একযুগে জাফলং বনবিটের ৪০ শতাংশ জমিই হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগের।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এসএম সাজ্জাদ হোসেন একটি সেমিনারে শ্রীলঙ্কায় রয়েছেন। তার আগে সিলেটের ডিএফও’র দায়িত্বে থাকা এসএম মনিরুল ইসলাম বর্তমানে বন বিভাগের কেন্দ্রীয় বন সংরক্ষক পদে আছেন। তিনি বলেন, মোহাজেরদের দাবির কোনও ভিত্তি নেই। তাদের সামনে রেখে একটি ভূমিদস্যু গ্রুপ বনের জমি দখল করছে।

তিনি বলেন, এখানকার প্রায় সাড়ে পাঁচশ একর জমি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ১৯৮৫ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হয়েছে। বাকী জমিগুলোতে দীর্ঘকাল ধরে বনাঞ্চল রয়েছে। ফলে এই জমি কাউকে বরাদ্দ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

তিনি বলেন, মোহাজেররা জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেছে। মামলা চলমান আছে। দখল উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি সিলেটের দায়িত্বে থাকতে ৩ বার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। ৭৬টি ক্রাশার মেশিন উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু অভিযান শেষ হলেই আবার তারা বসে যায়। জমি দখল করে নেয়। বনের জমি উদ্ধারে একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এজন্য সবার সদিচ্ছা দরকার। সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত প্রত্যাগত মুসলমান উদ্বাস্তুদের জাফলং এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। থাকার সুযোগ দিলেও কারো নামেই জমি বরাদ্দ দেয়নি সরকার। এখন মোহাজের দাবিকারী একটি গোষ্ঠী এই জমি নিজেদের দাবি করে দখল করে নিচ্ছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল বলেন, সরকার মোহাজেরদের নামে কখনও জমি লিখে দেয়নি। এসএ রেকর্ডে এগুলো বন বিভাগের নামেই উল্লেখ আছে। এছাড়া মোহাজের পরিবারগুলোও আর এখানে নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এখন হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার আছে। তারাই এই জমি নিজেদের দাবি করে একইসঙ্গে মামলাও করছে আবার দখলও করছে।

সরেজমিন দেখা যায়, জাফলংয়ে বন বিভাগের গুচ্ছগ্রাম, রহমতপুর, সোনাটিলা, তামাবিল, কানাইজুড়ি ও নলজুরি এলাকার বেশিরভাগ জায়গাই বেদখল হয়ে গেছে। মোহাজের পরিচয়দানকারী একটি গোষ্ঠী বন বিভাগের ভূমি দখল করার পর সেই ভূমিতে কয়লা ও পাথর রাখার ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন এবং স্টোন ক্রাশার মেশিন স্থাপনের জন্য ভাড়া দিচ্ছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও দখল করছেন বনের জমি। বর্তমানে শুধু বন বিভাগের ভূমিতেই রয়েছে প্রায় পাঁচশ’ কয়লা ও পাথর রাখার ডাম্পিং ইয়ার্ড এবং স্টোন ক্রাশার মেশিন। যদিও এসব স্টোন ক্রাশার মেশিনের একটিরও অনুমতি নেই বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাফলংয়ের মুসলিম নগর গ্রামের মৃত গোলাম হোসেনের ছেলে রফিকুল ইসলাম, কালিনগর গ্রামের নঈমুদ্দিনের ছেলে ফরমান ও তার ভাই ফরহাদ, লাখের পাড় গ্রামের মৃত তাজু শেখের ছেলে রইছ উদ্দিন, নলজুরী গ্রামের আবুল কাশেম খোকার ছেলে আজাদ, মোতালেব সরকারের ছেলে কাশেম সরকার ও তার ভাই কাউসার ও সোনা টিলা গ্রামের আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে মোহাজের পরিচয়ে বনের জমি দখল চলছে। তবে এদের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া রয়েছে বলে জানা গেছে। রাতের আঁধারে বনের গাছপালা কেটে দখল করে নেওয়া হয় জমি।

তবে বন বিভাগের জায়গা দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে রফিক মিয়া বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত প্রত্যাগত মোহাজেরদের জন্য তৎকালীন সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই জমি আমাদের বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দকৃত জায়গা আমরা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছি। এ লক্ষ্যে উচ্চ আদালতে মামলা করেছি।

তিনি বলেন, মোহাজেরদের নামে বরাদ্দকৃত ভূমিতেই আমরা ডাম্পিং করেছি। বন বিভাগের কোন জায়গা আমরা দখল করিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com