জীবনের উত্তরণ

প্রকাশিত: ২:৩১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৬, ২০১৯

জীবনের উত্তরণ

ওমর ফারুক : সৎ, সমাজের প্রতি নিবেদিত ও ভালো মানুষ পুলিশ কর্মকর্তা কী করতে পারেন- আদর্শ উদাহরণ ঢাকার ডিআইজি হাবিবুর রহমান, বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)। তার উত্তরণ ফাউন্ডেশন বদলে ফেলছে সাভারের অন্তত ২০ হাজার বেদে মানুষের জীবন।

 

এখানে প্রথম তার পা পড়ে ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে। বিখ্যাত তিনি, সফল মানুষ– হাবিবুর রহমান, বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) বাংলাদেশ পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম সর্বোচ্চ পদ ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ; উপ-মহাপরিদর্শক) পদে চাকরি করেন। ২০১৪ সালেই প্রথম মতবিনিময় সভাটি করেছিলেন তিনি অধীনস্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার অফিসার ও কনস্টেবলদের নিয়ে অক্টোবরের ১৮ তারিখে। অনেকবার খবর এসেছে তার কাছে, প্রমাণ পেয়েছেন তারা হাতেনাতে এবং ধরেছিলেনও মাদকের অপরাধীদের। আরও নানা ধরনের অন্যায়, অপরাধে যুক্ত তারা। কেউ ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী। কেউ-বা পথের মানুষ। পরে জেনেছেন, তাদের বেশিরভাগই একটি এলাকায় বাস করেন।

 

পেশায় তারা সুপ্রাচীন, বাংলার ঐতিহ্য তবে মান-সম্মান, জীবন ও সম্পদ খুইয়ে এখন অপাঙক্তেয় শ্রেণি। এই দেশ তাদের স্বীকার করলেও সাহায্য তেমন করে না। চেনেন সবাই– ‘বেদে’। সাভারের মূল উপজেলা সাভার-এ থাকেন তারা। চারটি গ্রামে ছড়িয়ে আছেন–বক্তারপুর, পোড়াবাড়ি, আমরপুর ও কাঞ্চনপুর। এখানে বংশী নদীর ধারে, নদীকে ঘিরে জীবন তাদের। তাও অন্তত দেড়শ বছর ধরে বাস। পুরো দেশে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত কোনো ঋতুতেই তাদের নৌকা থামেনি। ২০-২৫ নৌকায় প্রতিটিতে পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি পূর্ণ জীবন। মেয়েরা নৌকা থেকে কাঁধে ঝুলি নিয়ে নেমেছেন কোনো না কোনো জনপদের ধারে, গ্রামের পাশে; হাটে-বাজারে। পুরুষরা তখন সংসার ও নৌকা সামলেছেন। ‘এই সাপের খেলা দেখাই’, ‘লাগব নি কো ঝাড়ফুঁক?’ বলে কল্লোল স্বরে হাটে-ঘাটে নেমেছেন তারা। মানুষের দলে মিশেছেন। সব জাত ভাই-বোনদের মতো বংশীর এই সন্তানরাও ঝাড়ফুঁক; তাবিজ, তুমার; সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলা, সাপের খেলা দেখানো ও পুরুষরা মিলে সাপ ধরার কাজ করেছেন।

 

তবে ধীরে ধীরে বংশী মরেছে, তারা লেখাপড়া করতে পারেননি এত বছরেও। উন্নত জীবন পাননি কোনো। তাই চলে গিয়েছেন অপরাধের দিকে। পুলিশের কাছে খবর আসে, গ্রামে গ্রামে নারীরা আগের মতোই জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেলেও পুরুষরা তখন একেবারে বেকার হতে থাকেন। সন্তানের দেখাশোনার কাজ তারা করেন ঠিকই; কিন্তু অলসতা, অভাব ও বাজে সঙ্গ এবং পরিবেশ তাদের নিয়ে গেল অপরাধের অন্যায় ভুবনে। মাদক বিক্রির অপরাধে জড়িয়ে গেলেন তারা। তাদের এলাকাগুলোতেই প্রকাশ্যে ও আড়ালে তাতে যুক্ত হলেন। বিক্রি করেন, নিজেরাও মাদক সেবন করেন। অভাব, অপরাধ তাদের নিত্যসঙ্গী। পরিবারে বিবাদ, কলহ, একে অন্যকে মারধর করতে করতে জীবনটাই শেষ করে দিচ্ছিলেন তারা। অন্যের জন্যও হয়ে উঠছিলেন বিভীষিকা। টেকনাফ, উখিয়ার মতো মাদকের আন্তর্জাতিক অন্যায় পথগুলো ধরে বাংলাদেশে চালানের অন্যতম বাহক হয়ে চলছিলেন মেয়েরাও। ফলে পুলিশের খাতায় তারা এলেন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে।

 

বিরাট এই জনগোষ্ঠী–অন্তত ২০ হাজারের বাস এখন চারটি গ্রামে। গরিবের গরিব মানুষগুলো। নৌকাতে, ডাঙাতে মাচান বানিয়ে থাকেন। চাল নেই, চুলো নেই। প্রথম সভাতেই হাবিবুর রহমান তাদের অনুরোধ করলেন, কড়জোরে মানা করলেন এবং জেল, শাস্তির ভয় দেখালেন। বেদে সর্দাররা ছিলেন তাতে। রুজির ব্যবস্থা করে দিলে আমরা ফিরে আসব স্বাভাবিক জীবনে–কথা দিলেন তারা। ফলে কাজ শুরু করলেন তিনি, তার বাহিনী ও বন্ধুরা। দফায়, দফায় পুলিশ ও বেদে সর্দার, সাধারণ বেদেনি, বেদের সঙ্গে আলাপ হলো। প্রায় সবকটিতেই ঢাকা থেকে গিয়েছেন তিনি। বললেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এখন স্বর্ণযুগ চলছে, ফলে কূপমণ্ডূকতার পেশা ছেড়ে, লোভের ও অজ্ঞানতার পথ ছেড়ে চলে আসুন। অভাব, জীবনের তাড়না ও লেখাপড়ার কোনো সুযোগ; জীবনের কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকা চোখে পড়ল বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর। সাভারের বিরাট বেদেপল্লীর জীবনটিকে বদলাতে মাঠে নামলেন তারা একজন সৎ, যোগ্য এবং মানবদরদী পুলিশ কর্মকর্তার ডাকে। সেই হাবিবুর রহমানই গড়ে তুললেন ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’।

 

হাবিবুর রহমান ও তার সঙ্গীদের ফাউন্ডেশনটি ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে মোট ১০৫ জন বেদেনিদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হলো। পরের বছরের ২৮ এপ্রিল তারা প্রত্যেকে সহজ শর্তে সেলাই মেশিন উপহার পেলেন। শুরু হলো বাংলার সুপ্রাচীন হাতের কাজের মাধ্যমে নারীদের জীবন বদলের সেই ইতিহাস সমৃদ্ধ করার সংগ্রাম। পরে আরও এগিয়ে গেল ফাউন্ডেশন। ৩৫ জন বেদেকে দেওয়া হলো গাড়ি চালানোর ড্রাইভারের নতুন জীবনের প্রশিক্ষণ। তাদের প্রত্যেককে যোগ্য করে ড্রাইভারের সরকারি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অনেককে হাবিবুর রহমান ও অন্যরা প্রয়োজনে পুলিশ বাহিনীসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুসারে নিয়ম মেনে চাকরি দিয়েছেন। ধীরে ধীরে ফাউন্ডেশন বেদে ও হিজড়াদের সমাজ ও জীবন বদলে দেওয়ার সংগ্রামে নেমেছেন।

 

বেদে ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর টেকশই বা দীর্ঘদিন ধরে জীবনমান উন্নয়নের জন্য ২০১৬ সালে তাদের এই উদ্যোগ হলো ফাউন্ডেশন। সে বছর গড়ে তোলা হলো ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’। প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)। পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের মালিক কামরুল হাসান শায়ক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফাউন্ডেশনে সব কাজে আর্থিক সাহায্য যতটুকু পারেন, করেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ যৌথ মূলধনী (জয়েন স্টক) কোম্পানি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন লাভ করেছে উত্তরণ ফাউন্ডেশন। নানা পেশায় যুক্ত নয় সদস্যের পরিচালনা কমিটি আছে। সবাই সহযোগিতা করেন। তারপরও কোম্পানিটিকে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্টজনের কাছ থেকে বেদে ও হিজড়া জনগণের উন্নয়নে সাহায্য নিতে হয়।

 

উত্তরণ ফাউন্ডেশন সাভারের পোড়োবাড়িতে একটি ঈদগাহ তৈরি করে দিয়েছে। তাদের নামাজ পড়ার জন্য একটি জামে মসজিদও গড়েছেন–‘হাবিবিয়া জামে মসজিদ’। সেখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাদের নিয়মিত কার্যক্রম মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বছর ১৫ আগেও এই চার গ্রামের মানুষরা তাদের পরম আত্মীয়কে কোথাও কবর দিতে পারতেন না। আশপাশের মানুষ তাদের সমাজে ঠাঁই দিত না। তারাও এড়িয়ে চলতে চলতে পুরোপুরি সমাজ ছাড়া আলাদা এক সমাজের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। মৃতের লাশ চোখের জলে ভাসিয়ে দেওয়াই ছিল একমাত্র সৎকার ব্যবস্থা। নোংরা, কাদায় জল জমে চলাই ছিল দায়; সেখানে এখন ১৪টি ছোট-বড় সংযুক্ত পাকা পথ তৈরি হয়েছে। আছে বড় তিনটি ড্রেন। ‘উত্তরণ ফ্যাশন হাউজ’ আছে। তাতে মোট ৮০ থেকে ১০০ জন বেদেনি গার্মেন্টকর্মী হিসেবে চাকরি করছেন। ভালো কাজ শেখার পর ফাউন্ডেশন ৬০ জনকে অন্য আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করেছে। তাদের পোশাক বিক্রি হয় সাভারের জামগড়া ও সিটি সেন্টারের সামনের ফাউন্ডেশনের গড়া দুটি আলাদা শো-রুমে– ‘উত্তরণ বুটিক’। সেখানেও কাজ করা সবাই বেদে-বেদেনি। এই প্রতিষ্ঠানের স্লোগান– ‘নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম’।

 

গ্রামগুলো ঘিরে আছে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য উত্তরণ শিক্ষালয় নামে এক পাঠশালা। এখন আড়াইশ ছাত্রছাত্রী পড়ছে। অনেকে ভালো ফলাফল করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘উপবৃত্তি’ চালু আছে। মেধাবী এসব শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করছেন অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। লেখাপড়ার আলোয় আনার বিনিময়ে তারা একটি টাকাও কেউ নেন না। উত্তরণ ফাউন্ডেশনের টাকায় স্কুল তৈরির জন্য আমরপুরে ৩৮ শতক জায়গা কেনা হয়। এই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ১৯ সালের ২২ এপ্রিল ভিত্তি গেড়ে দিয়েছেন। তাতে তাদের জীবন বদলের নায়কের নামে ‘হাবিবুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হবে। সরকারি অনুদানেই তৈরি হবে স্কুল ভবন।

 

সাভারের খঞ্জনকাঠিতে (পোড়াবাড়ি) উত্তরণ ফাউন্ডেশন মোট সাড়ে তিন একর জায়গা সরকারের আশ্রয়ন প্রকল্প হিসেবে বরাদ্দ পেয়েছে। তাতে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল প্রাকৃতিক তাণ্ডবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্ষম দুর্যোগ সহনীয় মোট ৫০টি ঘর বানিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ‘উত্তরণ পল্লী’। ফলে আর প্রকৃতির কাছে হেরে যাবেন না প্রকৃতির সন্তানরা। সেখানে পথের মানুষ, ঠিকানাহীন বেদেদের জন্য গুচ্ছগ্রাম তৈরি হচ্ছে। তাদেরসহ বাংলাদেশের প্রাচীন, অন্যরকম, প্রায় হারিয়ে যেতে থাকা নানা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সাভারের বেদে পাড়াতে নিজ উদ্যোগে জাদুঘর তৈরি করবেন হাবিবুর রহমান। জীবন নিজেরাই যেন বদলাতে পারেন সাবেক ও এখন বেদের পেশায় থাকা মানুষগুলো, তাদের পাড়াগুলোকে মাদক, সাপের খেলাসহ নানা অন্যায় থেকে বাঁচাতে তৈরি করে দিয়েছেন তারা ‘ পোড়াবাড়ি সমাজ কল্যাণ সংঘ সমবায় সমিতি’। তরুণ, সমাজপতিরা গ্রাম চারটিকে সংঘের মাধ্যমে অন্যায় থেকে বাঁচাচ্ছেন। আছে আলাদা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র– ‘উত্তরণ কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার’। পরিচালনা করে ফাউন্ডেশন। ছাত্রছাত্রী থেকে বয়স্ক সবাই কম্পিউটার শিখতে পারেন। ১শ থেকে ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী পাস করে নানা পেশায় যোগ দিয়েছেন। তিন শিফটে তাদের মৌলিক ও অফিশিয়াল কাজগুলো শেখানো হয়।

 

কোনো কাজ করতে পারেন না, এমন গরিব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য হাবিবুর রহমান সমাজসেবা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে বয়স্কভাতা চালু করেছেন। না খেয়ে আর মরছেন না এককালের দুর্ধর্ষ এখন বোঝার মতো বয়স্করা। নিজের খরচে তিনটি বিয়ের যোগ্য মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাবিবুর রহমান। ১৮ বছরের বেশি বয়সের সব নারীর বিয়ের খরচ একসময় নিজেরা শত কষ্টেও চালিয়ে গিয়েছেন তারা। ফলে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে পুরো সমাজ। এই পর্যন্ত ২৫ জন বেদে তরুণকে ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত সজাগ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করে খাচ্ছেন। প্রতি শীতে নিজের ও ফাউন্ডেশনের খরচে নিয়মিত তিনি ও তারা শীতবস্ত্র বিতরণ করেন, নানা ধরনের রোগীদের চিকিৎসার খরচ ও তখন চলার পয়সা দেন। দুই ঈদ ও পহেলা বৈশাখে বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উপহার দেওয়া হয়। উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এবং হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোট নয়জন বেদে-বেদেনি (১ জন নারী) বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করছেন। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আছেন তাদের সমাজের। অন্য আরেকজন দি একমি ল্যাবরেটরিজের কর্মকর্তা। ঢাকার মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে অধ্যাপনা করেন জুলেখা বেগম। মুন্সীগঞ্জ থেকে এই বেদেনিকে ধরে এনে জীবনের আলো দিয়েছেন হাবিবুর রহমান। এখন তিনি বাংলাদেশের আলো হয়েছেন। আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে সেভাবে চাকরি পেয়ে খুব ভালো আছেন মাজেদা বেগম।

 

বেদে-বেদেনিরা এখন আর তেমন কোনো অপরাধ করেন না। বরং সমাজে কোনো অপরাধের শিকার হলে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তারা সাহায্য পান। তাদের অপরাধের প্রবণতা কমিয়ে আনতে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)’র এর নির্দেশ মতো সাভার মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাদের সমস্যাগুলো ভালোভাবে দেখেন। এভাবেও বদলে যাচ্ছে হাজার হাজার জীবন। তাদেরই একজন অঞ্জলি বেগম, ‘আমার মতো অনেক বেদেনি, বেদে এখন সাভার, আমাদের গ্রামগুলোর বাজারে নানা ধরনের ছোট দোকানদার। বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করেও অনেকের ভাগ্য বদলে যাচ্ছে। অনেকের কাপড়ের দোকান, টেইলার শপ আছে। বিষধর বিষে এখন আমরা আর মরি না।’ ফলে খুব খুশি ‘বাংলাদেশ বেদে ফেডারেশন’র সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ– ‘মানুষ চাইলে পুরো সমাজ বদলাতে পারে; পুলিশ আমাদের বন্ধু; তারা জীবনের সঙ্গী–সবই প্রমাণ করেছেন হাবিবুর রহমান স্যার তাদের উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে।’ তার গ্রামগুলোতে অনেকে জীবন বদল করে পাকা বাড়ি তুলেছেন। নিজেরা ভালো আছেন, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে। তাদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পোড়াবাড়ি, সাভার পৌরসভা–এই ঠিকানায় ‘ পোড়াবাড়ি সুদমুক্ত প্রকল্প গ্রাম, পোড়াবাড়ি, সাভার পৌরসভা, সাভার, ঢাকা’ চালু আছে। তাতে সরকারিভাবে সুদহীনভাবে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ব্যবসা করে জীবন গড়ছেন অনেকে। তবে এখনো গ্রামগুলোতে রাস্তা পুরোপুরি ভালো হয়নি। ভালো পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা নেই, মানুষ ভালো বাথরুম ব্যবহার করতে পারছেন না। কাজের ব্যবস্থা হয়নি সবার। বিশুদ্ধ পানি, গ্যাসের সুবিধা আসেনি। কবরস্থান নেই বলে পাশের গ্রামগুলোতে অনুরোধ করে লাশ দাফন করতে হয়। এখন তারা মানুষের কাতারে আসছেন বলে সম্মতি পান। ফাউন্ডেশন যেভাবে তাদের জীবন বদলাতে উন্নয়নে কাজ করছে, তাতে কিছুদিনের মধ্যেই বেদে ও হিজড়ারা নিজেদের সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে পারবেন বলে বিশ্বাস করছেন। ফলে সমাজের মানুষদের তাদের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ করলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রমজান। তবে কোরবান আলী নামের মুদি দোকানদার বললেন, ‘এখনো আমাদের সাপের বিষের খেলা থামানো যায়নি।’

 

১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার গোপালগঞ্জ পৌরসভার সদর উপজেলার চন্দ্র দিঘলিয়া গ্রামে জন্ম নেন। বাবা আলী মোল্লা আর বেঁচে নেই। তার একমাত্র ছেলে এবং সবার বড় সন্তান হাবিব। তবে অন্যরাও কৃতি। এক মেয়ে ইউসিবি (ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড)’র হেড অফিসে ভালো পদে চাকরি করেন। অন্যজন গৃহিণী, আরেকজন মারা গিয়েছেন। তার বড় ছেলে হাবিবের লেখাপড়া শিক্ষা শুরু মোল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্দ্র দিঘলিয়াতে। এলাকার স্কুল, সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, গোপালগঞ্জ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এই মেধাবী ছাত্র শিক্ষার্থী। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। এরপর ১৭তম বিসিএস দিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে পুলিশ ক্যাডারে মনোনীত হন।

 

হাবিবুর রহমান ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭তম সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে যোগ দিলেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে অনেকগুলো দায়িত্বপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। তিনি রাজধানী ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (কার্যক্রম তত্ত্বাবধান কর্মকর্তা) ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরে উপ-মহাপরিদর্শক (প্রশাসন-ডিসিপ্লিন) হিসেবে ছিলেন। কর্মক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা, প্রশংসনীয় ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য তিনবার পুলিশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি– ‘বাংলাদেশ পুলিশ’স মেডেল (বিপিএম)’ ও দুইবার ‌‘প্রেসিডেন্ট’স পুলিশ মেডেল (পিপিএম) লাভ করেছেন। পরপর দুই বছর– ২০১৬ এবং ’১৭ সালে পুলিশ সপ্তাহে তাকে প্রশংসনীয় ও ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আইজিপি’স (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ) ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দারুণ এই পুলিশ কর্মকর্তা সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করেন। একজন সফল ক্রীড়া সংগঠক হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের এখন সাধারণ সম্পাদক। এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছেন এবং তিনি জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের এখন সভাপতি হিসেবে আছেন। রাজারবাগের দোতলা এই পুলিশ জাদুঘরের বেজমেন্টে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’, গ্রাউন্ড ফ্লোরে ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’ হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কাচের দেয়ালের বাক্সে থরে থরে সাজানো মুক্তিযুদ্ধে তাদের অস্ত্র, জীবন দানের ইতিহাস আছে। বঙ্গবন্ধু গ্যালারির প্রবেশমুখে শেখ মুজিবুর রহমানের দুর্লভ ছবি আছে। সেখানে তার ওপর তৈরি দুটি প্রামাণ্যচিত্র আছে।  স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান ও ঢাকায় তাদের প্রথম প্রতিরোধ নিয়ে হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)’র লিখেছেন “মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ” নামের বই। তার স্ত্রী ডা. ওয়াজেদ সামসুন্নাহার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক। তিনিও স্বামীর মতো বিসিএস ক্যাডার। তাদের একমাত্র সন্তান আফতান আফিফের বয়স তিন বছর মাত্র।

 

কেন মানুষের উপকারে আছেন–এই প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর রহমান বললেন, ‘মানুষ, সমাজ ও পৃথিবীর যদি কিছু করতে পারি, সেটিই আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি হবে। সেজন্য কাজগুলো করি। মানব সেবাই আমার বিনোদন। তৃপ্তি ও শান্তি। অনেকেই জানেন না, আমি বাংলাদেশ পুলিশ ব্লাড ব্যাংকেরও প্রতিষ্ঠাতা।’

 

আলোচিত ফাউন্ডেশন ও তাকে নিয়ে লিখেছেন এবং ছবি তুলেছেন ওমর ফারুক। সুত্র : দেশ রুপান্তর

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  

Flag Counter

Ad area

 

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com