পুলিশ ফাঁড়িকে টর্চার সেল বানিয়েছিলেন আকবর, মুখ খুলছেন ভূক্তভোগীরা

প্রকাশিত: ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২০

পুলিশ ফাঁড়িকে টর্চার সেল বানিয়েছিলেন আকবর, মুখ খুলছেন ভূক্তভোগীরা

সুরমা মেইল ডেস্ক ,

 

সিলেট নগরের বন্দরবাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্কের নাম ছিলেন এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন, অর্থ আদায়, মাদক দিয়ে ফাঁসানোসহ অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আশপাশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় ও ফুটপাতে হকার বসিয়ে নিয়মিত বখরা আদায় করতেন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এই বহিস্কৃত ইনচার্জ।

 

এসআই আকবর যোগ দেওয়ার পর থেকেই এই ফাঁড়ি হয়ে ওঠে টর্চার সেল। গত রোববার (১১ অক্টোবর) আকবরের এই টর্চার সেলে নির্যাতনে মারা যান নগরের আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদ (৩৩)। মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য তাকে হতৌা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে রায়হানের পরিবার। রায়হানকে নির্যাতনের সাথে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এসআই আকবরসহ এই ফাঁড়ির ৪ পুলিশ সদস্যকে। এরপর থেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন আকবরের হাতে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিতরা।

 

বন্দরবাজার, কাষ্টঘর, মহাজনপট্টি এলাকার সাধারণ ব্যবসায়িরাও বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হয়েছেন এসআই আকবর সহ বন্দরবাজার  ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের দ্বারা। বুধবার রায়হান হত্যা মামলার তদন্তে পিবিআই দল বন্দরবাজার ফাঁড়ি পরিদর্শনে গেলে সেখানে সমবেত হয়ে ক্ষোভ জানান ভূক্তভোগিরা।

 

সবজি ব্যবসায়ি তমিজ আলী বলেন, সকালে সবজি নিয়ে এলাকায় এলেই সবজির ভার আটকে দিয়ে সাথে গাঁজা আছে বলে দাবি করা হয়। তাদের টাকা দিয়ে তবেই ছাড় পাওয়া যায়।

সাথে গাঁজা না থাকলে টাকা দেন কেন, এমন প্রশ্নে তমিজ আলী বলেন, গাঁজা তো তাদের কাছেই থাকে। আমি না বললে সেটা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দেবে।

 

স্থানীয় ইলেকট্রিক ব্যবসায়ি ফয়েজ বলেন, কতবার যে তাদের হয়রানির শিকার হয়েছি তার ঠিক নেই। কিন্তু কার কাছে অভিযোগ করব? এসআই আকবের নেতৃত্বে এই এলাকায় তাদেরই নেতৃত্ব। একটু আঁধার হলেই স্বরূপে আসে তারা।

 

বন্দরবাজার এলাকার স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ হকার, আবাসিক হোটেল, মাদকদ্রব্য কেনা-বেচার স্পট, নিশীকন্যাদের অসামাজিক কার্যকলাপের স্পট, ছিনতাইকারী গ্রুপ, জুয়া খেলার স্পটগুলো থেকে প্রতিদিন, সপ্তাহ ও মাসিক হিসাবে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন এসআই আকবর। তার নির্দেশে নিরীহ পথচারীদের আটকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করতেন বন্দরবাজর ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা।

 

নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভুক্ত তালতলা থেকে জিন্দাবাজার পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ভাসমান হকার রাস্তা ও ফুটপাতে বসেন। এর মধ্যে প্রত্যেক স্থায়ি হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা এবং ভ্রাম্যমাণ হকারদের কাছ থেকে ২০ টাকা করে চাঁদা ওঠাতেন এসআই আকবর। এ হিসেবে বন্দর ফাঁড়ির নামে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা উত্তোলন করা হতো হকারদের কাছ থেকে।

 

অসামাজিক কাজের সুযোগ করে দিয়ে কয়েকটি হোটেল থেকে মাসোয়ারা আদায় করতেন আকবর। তার ফাঁড়ি এলাকার সুরমা মার্কেটে ২টি, জিন্দাবাজারে ২টি ও কালীঘাটে ২টি- এই ৬টি আবাসিক হোটেল থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার নিতেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

 

বন্দর এলাকাভিত্তিক মাদকদ্রব্য বিক্রির একটি বিশাল সিন্ডিকেট পোষতেন এস.আই আকবর। কাষ্টঘর ও কিন ব্রিজের নিচে মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরণের মাদকদ্রব্য বিক্রি করতো এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা নিতো আকবর বাহিনী।

 

লালদিঘীরপাড়ের সাধারণ ব্যবসায়ীরাও রেহাই পাননি আকবরের কবল থেকে। বৈধ ব্যবসা করেও নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো তাদের। না দিলে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হেনস্থা করতেন আকবর। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি মাসে লালদিঘীরপাড়স্থ হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৩০ হাজার চাঁদা তুলতো আকবরের মদদপুষ্ট পুলিশ সদস্যরা।

 

প্রতিরাতে বন্দরবাজার এলাকায় ঘুরে বেড়ায় ছিনতাইকারী কয়েকটি গ্রুপ। তারা সুযোগ বুঝেই হামলে পড়ে পথচারীদের উপর, ছিনতাই করে সর্বস্ব লুটে নিতো সাধারণ মানুষের। এই ছিনতাইকারীদের কয়েকটি গ্রুপকে শেল্টার দিতেন আকবর। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে পেতেন বড় অংকের টাকা।

 

বন্দরবাজার, কিন ব্রিজের মুখ, সুরমা মার্কেটের ও করিমুল্লাহ মার্কেটের সামন এবং ধোপাদিঘীর পূর্বপাড়ের সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে মাসোয়ারা আদায় করতেন এসআই আকবর।

 

সুরমা মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ভোরে এবং রাতে ঢাকা অথবা সিলেটের বহিরাঞ্চল থেকে আগত নারী-পুরুষদের রাস্তা থেকে ধরে ফাঁড়িতে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্চিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিলো এসআই আকবরের নিত্যদিনের কাজ।

 

গত ১১ অক্টোবর রাতে এই ফাঁড়িতেই নির্যাতনে নিহত হয় আখালিয়ার যুবক রায়হান। রাত তিনটায় ধরে এনে ছয়টা পর্যন্ত নির্যাতন চালানো হয় তাকে। পরিবারের কাছে কল দিয়ে দাবি করা হয় ১০ হাজার টাকা। পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে আসার আগেই নির্যাতনে রায়হানের অবস্থা হয় মুমুর্ষূ। তিন ঘন্টা নির্যাতনের পর সকাল ছয়টায় হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। তখন হাঁটতেও পারছিল না রায়হান। হাসপাতালে যাবার কিছুক্ষণে মধ্যে রায়হান মারা গেলে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে বলে প্রচার করে পুলিশ।

 

এ ঘটনার প্রতিবাদ জানায় রায়হানের পরিবার। ক্ষোভ দেখা দেয় এলাকায়। নিহতের স্ত্রী মামলা দায়ের করলে বাধ্য হয়ে একটি তদন্ত টিম করে সিলেট মহানগর পুলিশ। শুরু হয় পুলিশের লুকোচুরি। কিন্তু আশপাশের সিসি ক্যামেরায় ফাঁস হয়ে যায় সব গোমর। জানা যায় সেদিন রাতে কোনো গণপিটুনির ঘটনাই ঘটেনি। বাধ্য হয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত এবং এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।

 

তবে মহানগর পুলিশের গড়িমসি ধরা পড়ায় মঙ্গলবার মামলাটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেসন (পিবিআই) এ।

 

বুধবার একাধিক সূত্র দাবি করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির টর্চার সেল পরিচালনা করতেন ফাঁড়ি ইনচার্জ আকবর ভূইয়া। সুদর্শন এই এসআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই।

 

অভিযোগ আছে, বন্দরবাজার এলাকার পাশে কাষ্টঘর ও ক্বীনব্রিজ এলাকাকে কেন্দ্র করে বড় একটি মাদক সিন্ডিকেটও পরিচালনা করা হয় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে।

 

বুধবার এসব অভিযোগে দফায় দফায় ঘেরাও করা হয় বন্দরবাজার ফাঁড়ি। তবে বরাবরের মতই নীরব মহানগর পুলিশ।

 

অভিযোগের ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফুল্লাহ তাহের বলেন, তিনি মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে দায়িত্ব পেয়েছেন। এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com