প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কি পেলো বাংলাদেশ?

প্রকাশিত: ২:১৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০১৯

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কি পেলো বাংলাদেশ?

সুরমা মেইল ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের মাঝেই শনিবার তার সঙ্গে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক হয়েছে। হায়দ্রাবাদ হাউজে শনিবার (০৫ অক্টোবর) সকালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আগে দুই প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ একান্তে কথা বলেন। বৈঠকে দু’দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুই দেশের নেতারা তিনটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। খবর বিবিসি বাংলার।

 

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটাই শেখ হাসিনার প্রথম দিল্লী সফর। এর আগে ২০১৭ সালে তিনি সর্বশেষ দিল্লি সফর করেন। কিন্তু যেসব ইস্যুকে বাংলাদেশের নেতারা এর আগে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো নিয়ে বৈঠকে কী কথাবার্তা হয়েছে?

 

তিস্তা নদীর পানিবন্টন

প্রত্যাশিতভাবেই তিস্তা নিয়ে আলাদা কোনও সমঝোতা বা চুক্তি এই সফরে স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী মোদীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, “তিস্তার পানিবন্টন নিয়ে ২০১১ সালে দুই দেশের সরকার যে অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামোয় একমত হয়েছিল, কবে তার বাস্তবায়ন হবে বাংলাদেশের জনগণ কিন্তু অধীর আগ্রহে সেই অপেক্ষায় আছে।”

 

যৌথ বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী জবাবে বলেছেন, তার সরকার তিস্তায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেছে যাতে যত দ্রুত সম্ভব একটি তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা যায়। এগুলো অবশ্য বিশেষ নতুন কোনও কথা নয়। আগেও বহুবার এই ধরনের কথাবার্তা দু’দেশের পক্ষ থেকে শোনা গেছে।

 

নতুন যেটা তা হল, তিস্তা ছাড়াও আরও ছয়টি অভিন্ন নদীর (মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা, দুধকুমার) জল কীভাবে ভাগাভাগি করা যায়, অবিলম্বে তার একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করতে দুই নেতা যৌথ নদী কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও ফেনী নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়েও অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামো তৈরি করতে কমিশনকে বলা হয়েছে।

 

প্রসঙ্গত, এই ফেনি নদী থেকেই ১.৮২ কিউসেক পানি নিয়ে ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে পানীয় জল সরবরাহেও বাংলাদেশ রাজি হয়েছে।

 

ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই সাতটি অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে যে দ্বিপাক্ষিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে – সেই একই ফর্মুলা ভবিষ্যতে তিস্তার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তিস্তা চুক্তির প্রশ্নে এই সফরে আদৌ যদি কোনও অগ্রগতি হয়ে থাকে, তা এটুকুই।

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শব্দটি অবশ্য ব্যবহার করা হয়নি, বলা হয়েছে ‘মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে আশ্রয়চ্যুত মানুষজন’। এই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত আরও সক্রিয় ভূমিকা নিক, মিয়ানমারের ওপর আরও বেশি করে তাদের প্রভাব খাটাক – বাংলাদেশ এই অনুরোধ জানিয়ে আসছে বহু দিন ধরে।

 

শনিবার দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ প্রশস্ত করতে যে অধিকতর প্রয়াস দরকার, তারা সে ব্যাপারে একমত হয়েছেন।”

 

“মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়েই” যে সেটা করতে হবে, সে কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ভারত যে রাখাইন প্রদেশে ইতোমধ্যেই ২৫০ বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে এবং ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে আরও বাড়ি নির্মিত হচ্ছে সেটাও উল্লেখ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য গত দু’বছর ধরে ভারত যে মানবিক ত্রাণ পাঠিয়ে আসছে, তার জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এগুলোও কোনটাই বিশেষ নতুন কোনও কথা নয়।

 

বরং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার প্রশ্নে ভারতের কাছ থেকে যে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা বাংলাদেশ আশা করছিল, তা তেমন পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ভারত এক্ষেত্রে তার দুই বন্ধু দেশ, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একটা ভারসাম্যের নীতি নিয়েই এতকাল চলেছে – শেখ হাসিনার এই সফরেও দিল্লির সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।

 

এনআরসি বিতর্ক

ভারত ও বাংলাদেশ এদিন যে যৌথ বিবৃতিটি জারি করেছে, সেই সুদীর্ঘ বয়ানের কোথাও এনআরসি শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত নেই। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, “আমরা তো বরাবরই বলে আসছি জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাহলে আন্তর্জাতিক স্তরের একটি যৌথ বিবৃতিতে কেন তার উল্লেখ থাকতে যাবে?”

 

কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু ঘটনা হল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কিছু নেই – এই আশ্বাসটা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখ থেকে আসুক।

 

সপ্তাহখানেক আগে নিউ ইয়র্কে দুজনের বৈঠকের পর নরেন্দ্র মোদীকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তিনি শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন এতে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।

 

এই কথাটাই দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে বলুন, বা ভারত সরকার অন্য কোনোভাবে প্রকাশ্যে জানাক – এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

 

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা অন্যান্য বিজেপি নেতারা যেভাবে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে চলেছেন এনআরসি-বাতিলদের বাংলাদেশেই ডিপোর্ট করা হবে, সেই পটভূমিতে এটা ছিল বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

 

বিষয়টি নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্তে কথাও হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যৌথ বিবৃতিতে প্রসঙ্গটির কোনও উল্লেখ না-থাকায় এনআরসি প্রশ্নে বাংলাদেশের অস্বস্তি কাটল, এটাও কিন্তু বলা যাচ্ছে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Flag Counter

Ad area

 

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com