প্রচ্ছদ

‘বিবর্ণ’ কাব্যে বিরহী গন্ধ

২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:৫৯

নাসিম আহমদ লস্কর

সাহিত্য মানুষকে আনন্দ জোগায়, মানুষের দুঃখ নিবারণ করে। মানুষের জীবনপ্রণালি, আদর্শ, মূল্যবোধ সবই সাহিত্যের আলোচ্য বিষয়। বাঙালী মন সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই কবিতামনা। কবিতায় তাঁরা খুজে নেয় জীবনের গন্ধ, যৌবনের গন্ধ, হাসিকান্নার শব্দ, যাপিত জীবনের আবহ।

কবি জিয়াউর রহমান একজন কবিতার লেখক ও পাঠক। কবিতার রূপ, রস, গন্ধে তিনি হারিয়ে যেতে চান। কবিতায় খুঁজে ফেরেন জীবনের তাৎপর্য। রাত -দুপুরে তিনি মগ্ন থাকেন কবিতা লিখতে কিংবা পড়তে। অমর ২১ শে বইমেলা ২০১৮ তে সিলেটের পায়রা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বিবর্ণ’।  প্রকাশক: সিদ্দিক আহমদ। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘মাহমুদা সুলতানা তৃপ্তি’ -কে। ৮০  পৃষ্ঠার এ বইটিতে মোট ৫৫ টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এ নিবন্ধে কয়েকটি কবিতা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

‘মধ্যবিত্ত জীবন’ দ’ুটি জ¦ালাময়ী শব্দ। জীবনে মানুষ কত স্বপ্নের ফানুস ওড়ায়। মধ্যবিত্ত জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এসব সুমধুর স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায়। প্রত্যশিত স্বপ্ন বিলীন হলে মানুষ দিশা হারিয়ে ফেলে। বিবর্ণ হয়ে যায় জীবনের রং। কবি তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন এ অমোঘ সত্যের কথা।
‘উন্মুনা হয়ে শান্তি খুঁয়েছি
আমার নাইরে কিছু,
সবার দেখিই সবই রযেছে
আমিই রয়েছি পিছু।
————————-
যেদিকে তাকাই নিকষকালো
সুখের দেখা নাই,
বিবর্ণতায় জীবন ভরেছে
আমি কি পাবো না ঠাঁই।’
‘বিবর্ণ’
ঋতু পরিবর্তনের পালাক্রমে গ্রীষ্মের পরে বর্ষা আসে। এ সময়কালে প্রকৃতি ঘুমোটকালো অন্ধকার রূপ ধারণ করে। প্রকৃতির চেহারায় বিরহী ভাব দেখা যায়। মানবমনও যখন বিরহে নিমজ্জিত হয় তখন বিবর্ণ রূপ ধারণ করে। আবেগের বশে অনেক সময় কেঁদে ফেলে। কথায় আছে, ‘কান্নায় শোক মন্দীভূত হয়।’ অনেক সময় কান্নার ফলে মানুষের মনের বিরহী ভাবটা কিছুক্ষণের জন্য দূর হয়ে যায়। কবির কবিতা প্রকৃতির প্রতীকে জীবনের প্রতিকূল সময়ের কথা ফুটিয়ে তুলেছে।
‘বৃষ্টি ঝরায় কালো মেঘে
বাতাস করে খেলা
প্রকৃতিরও কষ্ট আছে
কাঁদে বেলা অবেলা।
—————————————-
কান্না অনেক স্বস্তি আনে
হৃদয় করে শান্ত
কমবেশি শোক সবার আছে
মানুষ যদি জানতো!’
‘প্রকৃতির কান্না’
প্রিয়জনের সাথে মানুষের থাকে কত সুখময় স্মৃতি। ভালোবাসার রঙিন দিনগুলোতে মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনে পা দেয়ার। কিন্তু যখন প্রিয়জন সামান্য ভুল বোঝাবুুঝির কারণে দূরে চলে যায তখনই জীবনের সব স্বপ্ন ছাই হয়ে যায়। অশান্তি, নির্জীবতা, হাহাকার, শূন্যতা মানুষকে আঁকড়ে ধরে। কবি তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন শাশ^ত ভালোবাসার প্রতারিত রূপটির বেদনাহত আবহ।
‘তোমার আগে তুমি ছিলে
আবেগে ভরা জীবন দিলে,
মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে
দিন কেটেছে হেসে হেসে।

কত কথা তোমার সনে
হতো একা নিজের মনে
স্বপ্ন উড়ে বাঁশি শুনে
সময় যেত গুনে গুনে।
———————-
শোনাও কেন বিদায় -বাণী
বর্ষা এনেছে দু -চোখে পানি।
————————-
নিজের জ্বালায় আজ জ¦লে হায়
অশান্তি বুকে দিন চলে যায়।’
‘বেদনার রং’
প্রিয় মানব -মানবীর মুখ দেখলে প্রতিটি মানুষের ভেতরে অনুরাগ কাজ করে। ভালোবাসার মোহে বিমোহিত হয়ে পড়ে মানুষ। ভালোবাসার মানুষটিকে জড়িয়ে রাখতে চায় পরম আদরে। যুগ যুগ কাটিয়ে দিতে চায় নীড়ের কপোত -কপোতী হয়ে। কবি ভালোবাসা পাগল মানব -মানবীর মনের নদীতে ঢেউ উঠা জোয়ারের কথা সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন কবিতায়।
‘অমন করে তাকিয়ো না আর
লজ্জা রাঙা চোখ মুখে,
বুকের ভিতর উতাল পাতাল
মরে যায় যেন সুখে।
————————
ওই রূপে গো আমি মরতে পারি
কথার কথা নয় গো,
সফলতা খুঁজি তোমাকে ঘিরে
লিখন সত্যি যেন হয় গো।’
‘অনুরক্তি’
ভালোবাসার মানুষকে মানুষ আজীবন কাছে পেতে চায়। প্রেমিক পুরুষ তাঁর বুকে আগলিয়ে রাখতে চায় জীবনের অণুপ্রেরণার স্বম্বলকে। সুখের সাগরে ভেসে যেতে চায় প্রিয় মানুষটির হাতে হাত রেখে। কবিতায়ও ফুটে উঠেছে সেই ভাবনা।
‘রিমঝিম বৃষ্টিতে কে তুমি ওগো
দাঁড়িয়ে বাতায়ন খুলে
সব ব্যথা ভুলে কাছে এসো
মিশো হৃদয় খুলে।

রেখনা নিজেকে আড়াল করে
শ্রাবণ মেঘের দিনে
রংধনু রং রাঙায়ে এসো
রিদম বাজাও বীণে।’
‘ও মেয়ে’
বইটির বেশিরভাগ কবিতায় বিরহী জীবনের গভীর ছাপ পাওয়া যায়। বইটি পাঠ করলে বিরহের স্বাদ পাওয়া যায় কাব্যিক গন্ধে। এ গ্রন্থটির কবিতাগুলো পাঠ করলে কবির ছন্দ বিষয়ক মুনশিয়ানার ও পরিচয় পাওয়া যায়। বইটি পাঠে একজন পাঠক অনায়াসে বিরহী জীবনের খুবলে খাওয়া বেদনার মলিন রূপ অনুভব করতে পারবেন। আমি বইটির পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।

কাব্যালোচক : নাসিম আহমদ লস্কর, শিক্ষাথী; বিবিএ প্রোগ্রাম- ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com