ভারতের উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বাজার বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০১৬

ভারতের উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বাজার বাংলাদেশ

images (1)

সুরমা মেইল নিউজ : প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত দেশ হতে যাচ্ছে ভারত। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলতি অর্থবছরই (২০১৬-১৭) দেশটিতে ৪ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে মোদি সরকার। উদ্বৃত্ত এ বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোয় রফতানি করতে চায় ভারত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই প্রধান বাজার মনে করছে দেশটি।

ভারত থেকে উদ্বৃত্ত এ বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বহরমপুর-ভেড়ামারা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনকে এক হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কাজ চলছে। ত্রিপুরা-কুমিল্লা ১০০ মেগাওয়াট সঞ্চালন লাইন ২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া আসামের বনগাঁ থেকে বাংলাদেশ হয়ে বিহার পর্যন্ত তৃতীয় একটি সঞ্চালন লাইন স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

বর্তমানে দুটি আন্তঃদেশীয় সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানি করছে ভারত। এর মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট আসছে বহরমপুর-ভেড়ামারা সঞ্চালন লাইন দিয়ে। ত্রিপুরা-কুমিল্লা সঞ্চালন লাইন দিয়ে আসছে বাকি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড কেন্দ্র থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানি করতে চায় বিদ্যুৎ খাতে ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আদানি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও পেয়েছে তারা। নওগাঁ জেলার সুবিধাজনক কোনো স্থান দিয়ে এ বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনও আদানিই নির্মাণ করবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আবুল বাছের খান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, একটি দেশের বিদ্যুৎ বিভিন্ন মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে। এর মধ্যে নিজস্ব উৎপাদন, আমদানি ও আন্তঃসীমান্তসহ নানা মাধ্যম রয়েছে। ভারত থেকে যে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, সেটা তাদের উদ্বৃত্ত কিনা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমাদের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণই মূল বিবেচ্য। তবে যে দেশ থেকেই বিদ্যুৎ আমদানি করা হোক না কেন, তা অত্যন্ত যুগোপযোগী চুক্তি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশের প্রায় ১০০টি বিদ্যুেকন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ১৪ হাজার ৭৭ মেগাওয়াট। নয় হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৮ হাজার ৪০০ থেকে ৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এ হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে।

বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা (পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১০) অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। ২০৩০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে। স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানির মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা হবে।

১৩ জুলাই ঢাকায় বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা-সংক্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির সভায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। সভায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরো কয়েকটি স্থানে আন্তঃসংযোগ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে বলে মত দেয়া হয়।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল উইং পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আমাদের যদি বিদ্যুতের ঘাটতি থাকে, চাহিদা থাকে, সেক্ষেত্রে যেকোনো দেশ থেকে আমরা বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারি। তবে আমাদের যে ক্রয়নীতি রয়েছে, তা মেনেই আমদানি করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও আমদানি ব্যয়ের সমন্বয়সহ নানা প্রক্রিয়া মেনেই আমদানি-রফতানি হয়ে থাকে।

চলতি অর্থবছরে ভারতে কোনো বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকবে না বলে ঘোষণা করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ; যা দেশটির ইতিহাসে এই প্রথম। ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (সিইএ) বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর সর্বোচ্চ চাহিদাকালীন (পিক আওয়ার) সময় ৩ দশমিক ১ ও কম চাহিদাকালীন (নন-পিক আওয়ার) সময়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকবে দেশটিতে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরে কিছুটা সময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত দেখালেও এই প্রথম জাতীয়ভাবে এ ঘোষণা দিল ভারত। উদ্বৃত্ত এ বিদ্যুৎই রফতানি করতে চাইছে দেশটি। যদিও গত অর্থবছরও পিক আওয়ারে ভারতের বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ২ ও নন-পিক আওয়ারে ২ দশমিক ১ শতাংশ। আর এক দশক আগে দেশটিতে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১৩ শতাংশ।

জানা গেছে, ভারতের ঝাড়খণ্ড কেন্দ্রে উৎপাদিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে সরবরাহ করবে আদানি পাওয়ার। ঝাড়খণ্ড রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে বিষয়টি। পিডিবি ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে এ নিয়ে গত বছরের আগস্টে একটি এমওইউ সই হয়। এর আগে ওই বছরই জুনে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় চুক্তির বিষয়ে যৌথ ঘোষণা দেয়া হয়। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, দুটি ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ বাংলাদেশে সরবরাহ করবে আদানি। গত ফেব্রুয়ারিতে এ বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য ঝাড়খণ্ড রাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে কোম্পানিটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ভারতের শত শত পণ্যের বাজার বাংলাদেশ। উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বাজার যদি হয়, তাতে কোনো সমস্যা দেখছি না। কারণ আসিয়ান জোটভুক্ত দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে। তবে বিদ্যুৎ আমদানির শর্ত ও চুক্তিগুলো যাতে স্বচ্ছ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com