মাদকদ্রব্য পরিদর্শকের ‘রোষানলে’ পড়ে জেল খাটলেন গৃহবধূ

প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

মাদকদ্রব্য পরিদর্শকের ‘রোষানলে’ পড়ে জেল খাটলেন গৃহবধূ

সুরমা মেইল ডেস্ক ,

 

কিশোরগঞ্জের ভৈরব সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক মো. মাসুদুর রহমানের রোষানলে পড়ে শিরিনা বেগম নামে এক গৃহবধূ জেল খেটেছেন।

 

৪০ দিন জেল খেটে বৃহস্পতিবার আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

 

ভুক্তভোগী শিরিনা জানান, গত ঈদের দুই দিন আগে ৩০ জুলাই মাদকদ্রব্য অফিসের পরিদর্শক মো. মাসুদুর রহমান দুজন অফিস সহকারীকে নিয়ে তার বাসায় অভিযান চালায়। তার স্বামীর নাম খোকন মিয়া এবং বাড়ি উপজেলার ছনছাড়া গ্রামে। ঘটনার দিন মাসুদুর রহমান একজন সোর্সকে দিয়ে এক কেজি গাঁজা কিনতে শিরিনাকে অনুরোধ করে।

 

এ সময় শিরিনা বলেন, আমার স্বামী গাঁজা সেবন করলেও গাঁজার ব্যবসা কখনও করে না। তাই গাঁজা কেনা সম্ভব নয়। তখন ক্ষিপ্ত হয়ে ওই পরিদর্শক বাসা তল্লাশি করে মগের ভেতর দুই পুটলা গাঁজা পায়। ঘটনার সময় তার স্বামী বাসায় ছিল না।

 

তিনি জানান, পুটলার গাঁজা আমার স্বামী সেবন করার জন্য রেখেছে, যা আমি জানতাম না। এ কথা বলার পর মাসুদুর রহমান শিরিনার কোলের শিশুসহ (৮ মাস বয়সী শিশু) তাকে আটক করে অফিসে নিয়ে যায়। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে ৬ মাসের সাজা প্রদান করলে পুলিশ তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

 

শিরিনার ৪টি সন্তান রয়েছে। পরিবারটি দরিদ্র। স্বামী ভ্যানগাড়িতে আচার বিক্রি করে সংসার চালায়। ঈদের দুই দিন আগে তাকে কারাগারে পাঠানোর কারণে তিনি পরিবারের সঙ্গে এবার ঈদ করতে পারেননি বলে জানান। তারপর তার স্বামী ব্যবসার শেষ সম্বল ভ্যানগাড়িটি বিক্রি করে অনেক কষ্টে স্ত্রীকে জামিনে মুক্ত করে।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর অফিসের পরিদর্শক মাসুদুর রহমান ইতোপূর্বে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ভৈরবের সম্ভুপুর এলাকার মাদকসেবী কালা মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুই পুটলা গাঁজা পেয়ে তাকে আটক করার পর ৩০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা করে।

 

এদিন তার মেয়ে শান্তা বেগমের বেতনের ১১ হাজার ৪০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে আসে। এরপর শান্তা বেগম বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ডিজির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন (অভিযোগের কপি এই প্রতিনিধির নিকট সংরক্ষিত আছে)।

 

এছাড়াও চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ এলাকার দ্বীন ইসলাম নামক এক মাদক সেবনকারীকে ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ আটক করে। এ দিন তার স্ত্রীকে আটকের ভয় দেখিয়ে গরু বিক্রির ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে বলে তার স্ত্রী সাহিদা বেগম অভিযোগ করেন। পরিদর্শক মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে- মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার মাসিক টাকার চুক্তি রয়েছে। চুক্তির টাকা সময়মতো না দিলেই তার রোষানলে পড়ে মাদক ব্যবসায়ীরা।

 

শিরিনা বেগম এই প্রতিনিধিকে বলেন, পরিদর্শক মাসুদের এক কেজি গাঁজা কিনতে রাজি না হওয়ায় তিনি আমাকে আটক করে সাজা দিয়ে জেলে পাঠান। বিনা অপরাধে কোলের শিশু নিয়ে আমি ৪০ দিন জেল খেটেছি। আমরা গরিব মানুষ। আমি তার বিচার দাবি করছি।

 

এ ব্যাপারে পরিদর্শক মাসুদুর রহমান জানান, শিরিনার বাসায় অভিযান চালিয়ে এক কেজি গাঁজা পেয়েছি বলেই তাকে সাজা দেয়া হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা কখনও সত্য কথা বলে না। তার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা-বানোয়াট ও কাল্পনিক বলে তিনি দাবি করেন। শান্তা বেগম ও সাহিদার অভিযোগ সত্য নয়।

 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুবনা ফারজানা যুগান্তরকে জানান, এ ধরনের মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে পরিদর্শক মাসুদুর রহমান ভ্রাম্যমাণ আদালতে শিরিনা বেগমকে নিয়ে আসবে তা আমরা জানি না। ঘটনার দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা প্রদান করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিমাদ্রি খিসা। পরে মিডিয়াকর্মীরা আমাকে প্রকৃত ঘটনা জানান। আদালতের আদেশ দেয়ার পর আমার কিছুই করার ছিল না সেদিন। তারপর গৃহবধূ শিরিনার জামিন পেতে আমি সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতে মাদকদ্রব্য অফিসারের কোনো ঘটনা হলে আমরা সাজা প্রদানে সতর্ক থাকব।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Flag Counter

আমাদের ভিজিটর সংখ্যা

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com