‘মুক্তির মঞ্চ’ রাজাকার পুত্রের দখলে! বিজয় দিবসে সবংর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা

প্রকাশিত: ১:২৪ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০১৯

‘মুক্তির মঞ্চ’ রাজাকার পুত্রের দখলে! বিজয় দিবসে সবংর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজেন বিজয় দিবসে সবংর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

 

বুধবার (০৪ ডিসেম্বর) উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে তাহিরপুর মুক্ত দিবসের আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন।

 

একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) সাব সেক্টরের অসংখ্য বীরের স্মৃতি বিজরিত ট্যাকেরঘাট ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি কয়েক কোটি টাকার জমি পাক-বাহিনীর দোসর স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান শামীম আহমদ তালুকদার গংদের দখল থেকে দ্রুত উদ্ধারের দাবিতে এমন ঘোষণা দেন বীরমুক্তিযোদ্ধারা।

 

আরও পড়ুন » ৭১’র মুক্তির মঞ্চসহ কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখল!

 

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) সাব সেক্টরের বীরমুক্তিযোদ্ধাগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ঠিকতে না পেরে ৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

 

এ দিবসটি সামনে রেখে গতকাল (বুধবার) তাহিরপুর উপজেলা সদরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে বিজয় র‌্যালী বের করা হয়।

 

র‌্যালী শেষে থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনের সামনে উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্ধ, গণমাধ্যমকর্মী ও জনপ্রতিনিধিগণের অংশগ্রহনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের দাবি তুলে ধরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, প্রতিবছর বিজয় দিবসে যথায় তথায় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে সবংর্ধনা প্রদান করা হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কাল থেকে প্রতি বছর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’-এ বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে সবংর্ধনা প্রদান আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, পালিত হতো জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবসসহ বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় দিবস পালন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক সভা সমাবেশ, অনুষ্ঠানমালা।

 

কিন্তু দূর্ভাগ্যজন হলেও সত্যি যে, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ৫নং সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখলে নিয়ে রেখেছেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সন্তান তাহিরপুরের তরং গ্রামের প্রয়াত রাজাকার আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদারসহ বেশ ক’জন প্রভাবশালীরা।

 

গত চার বছর ধরে এ দখল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগপত্র দেয়া হয় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বরাবর। কিন্তু অদৃশ্য কারণে দখল হওয়া সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কেবল নোটিশেই সীমাবদ্ধ রেখেছে প্রশাসন।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ আরো বলেন, উপজেলার তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত এসএ ও আরএস দাগে ৭৬.৩৬ একর সরকারি জমি রয়েছে। ওই মৌজার ওই দাগে খতিয়ানের থাকা প্রায় এক একর জমিজুড়ে থাকা ৭১’র মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন, ভবনের ভেতর থাকা জিনিসপত্রসহ জমি দখলে নেন পাকসেনাদের দোসর প্রয়াত রাজাকার দালাল আবদুর রউফের ছেলে শামীম আহমদের নেতৃত্বে থাকা একদল ভূমিখেকো দানব চক্র।

 

২০১৫ সালে রাতের আঁধারে ব্যক্তি মালিকানাধীন নাম সর্বস্ব একটি কিন্ডার গার্টেনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন।

 

পরে জনসমাগম ও প্রশাসনের দৃষ্টি আড়াল করতে জন চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও বন্ধ করে দেয়া হয়।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা বিজয় দিবসের প্রারম্ভে দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজাকার পুত্রের দখল হতে ‘মুক্তির মঞ্চ’ ও সরকারি জমি, শ্রমিক ইউনিয়ন, শ্রমিক কর্মচারী ক্লাব ক্যান্টিনসহ যাবতীয় মালামাল উদ্ধারের দাবি জানিয়ে বলেন, অন্যথায় বিজয় দিবসে প্রশাসনের আয়োজনে সবংর্ধণা অনুষ্ঠান বর্জন করতে বাধ্য হবেন জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ।

 

বহু ত্যাগে লাখ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে ট্যাকেরঘাটে থাকা ‘মুক্তির মঞ্চ’ এ সবংর্ধনা প্রদানসহ বিজয় দিবসের সবধরণের জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন করাও দাবি জানান।

 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডিজেন ব্যাণার্জীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল।

 

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার হাজি নুরুল মোমেন, সাবেক থানা কমান্ডার হাজি রৌজ আলী, রফিকুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আবদুস ছোবাহান আখঞ্জি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলী মর্তুজা, নুরুল আমিন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বিপ্লব, সোহেল প্রমুখসহ আওয়ামী লীগও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্ধ।

 

উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়ন সংসদ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা নুর মাহমুদ বলেন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) এ সাব সেক্টরের অধীনে বীরযোদ্ধা হিসাবে মেজর মুসলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রয়াত জাতীয় নেতা ও মন্ত্রী বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রয়াত বর্ষীয়ান রাজণীতিবিদ সাংসদ আবদুজ জহুর, প্রয়াত হোসেন বখ্তসহ অসংখ্য মুক্তিকামী বীরসেনার অংশগ্রহনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বীরত্বপুর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

 

ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টর মুক্তিযুদ্ধের এ তীর্থ ভুমিতে রয়েছে শহীদ সিরাজ বীর উরম সহ নাম না জানা বহু বীর শহীদগণের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের গণকবর।

 

আমাদের আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্যের মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন টিনশেড বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ করে রেখে বাইরে কিন্ডারগার্টেনের সাইনবোর্ড ঝুলালেও মূলত; ভেতরে রাজাকার পুত্র শামীম গংরা ভবনগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া প্রদান, গরু চড়ানোর মাঠ, মালবাহী লরি পিকআপ ভ্যান রাখা, নিজেদের ব্যক্তিগত অফিস হিসাবেই ব্যবহার করে আসছেন।

 

অবশ্য শামীম আহমদ তালুকদারের দাবি তার প্রয়াত পিতা আব্দুর রউফ পাকিস্তানী সেনাদের দোসর ছিলেন না, যে জায়গা দখলের অভিযোগ করা হয়েছে সেখানে মুক্তির মঞ্চ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো কিছুই ছিল না।

 

বুধবার রাতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডিজেন ব্যানার্জী বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মুক্ত দিবসের আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর প্রয়াত আব্দুর রউফের পুত্র শামীম আহমদ গংদের দখলবাজ আখ্যাযিত করে মুক্তির মঞ্চসহ সরকারি জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

 

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের পুর্বেই বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের দাবির আলোকে ট্যাকেরঘাটে ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি জমি দখলমুক্ত করনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান (ইউএনও)।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com