মৌলভীবাজারে দেশের একমাত্র মনিপুরি জাদুঘর

প্রকাশিত: ৮:০৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২

মৌলভীবাজারে দেশের একমাত্র মনিপুরি জাদুঘর

মনিপুরিদের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ ও তাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গড়ে ওঠেছে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’।


মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :
ইতিহাস-ঐতিহ্য ও যুদ্ধ-বিগ্রহের নানান উপকরণ সমন্বয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মনিপুরি জাদুঘর। মনিপুরিদের প্রাচীন বিলুপ্তপ্রায় সামগ্রীসহ ৩ শতাধিক উপকরণ স্থান পেয়েছে জাদুঘরটিতে।

 

২০০৬ সালে শুরু হওয়া দেশের একমাত্র আঞ্চলিক মনিপুরি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ব্যতিক্রমী এ সংগ্রহশালাটি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন, গবেষণার জন্য এ জাদুঘরটি তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ

 

মনিপুরিদের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ ও তাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গড়ে ওঠেছে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’। জাদুঘরে স্থান পাওয়া ৩ শতাধিক উপকরণের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যর সঙ্গে পরিচিত হতে এই সংগ্রহশালা অনন্য বলছেন নৃ তত্ব গবেষক ও দর্শনার্থীরা। এটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেশের একমাত্র জাদুঘর দাবি করে সরকারি পৃষ্টপোষকতার দাবি জানিয়েছেন জাদুঘরটির প্রতিষ্ঠাতা।

 

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন  নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস এক অন্য রকম বৈচিত্র্যময় আবহ তৈরি করেছে। মনিপুরী, গারো, ত্রিপুরা, মুন্ডা, ওরাঁও, খাসিয়া, সাওতালসহ নানা জাতিগোষ্টির সমৃদ্ধ বসবাস। এখানে বসবাসকারী মনিপুরীদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, বিশাল ইতিহাস, রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। মণিপুরীদের তাঁতশিল্পও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

 

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউপির ছনগাও গ্রামের হামোম তনু বাবু নিজ বাড়িতে মনিপুরী ঐতিহ্য লালিত প্রাচীন বিলুপ্তপ্রায় সামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি  ২০০৬ সালে তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’।

 

মনিপুরিদের আদি সংস্কৃতি ঠিকিয়ে রাখার পাশাপাশি গবেষনার কাজে এই মিউজিয়াম গুরুত্ব বহন করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠাতা।

 

জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠাতা মণিপুরী লেখক ও গবেষক  হামোম তনু বাবু জানান, প্রথমে এক দুটো উপকরণ সংগ্রহ, পরে নিজের বাড়িতে একটি রুমে শুরু করি। এখন আমার বাড়ির  ৪টি  কক্ষে তাকে-তাকে সাজানো আছে বিভিন্ন উপকরণ। ২০০ বছর পূর্বের ব্যবহৃত কয়েন, মনিপুর মহাকাব্যের নায়ক নায়িকার ছবি এবং যুদ্ধবিগ্রহে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে।

তাছাড়া প্রাচীন ঐতিহ্য ও নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে মনিপুরিদের আদি ধর্ম দেবতাদের পরিচিতি। আছে মনিপুরী নারীদের ব্যবহারের বিভিন্ন ধরনের গহনা, সাজসজ্জার উপকরণ। প্রাচীন কাঁসা পিতলের কলস, জগ, মগ।  বাস-বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী। আছে কাপড় বুননের প্রাচীন সরঞ্জামও। তাছাড়া কৃষি কাজে ব্যবহৃত উপকরণ ও প্রাচীন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও স্থান পেয়েছে এখানে।

 

মণিপুরী পাড়ার শিক্ষার্থী জয়া শর্মা জানান, আমাদের এলাকায় বিভিন্ন বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা আসেন ঘুরতে। এর পাশাপাশি অনেক পর্যটক আসেন ঘুরতে। তারা আমাদের গ্রাম ও বিভিন্ন ঐতিহ্য ঘুরে দেখেন। দেখতে আসেন মনিপুরি জাদুঘরও। জাদুঘরকে আরও আধুনিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে শিক্ষার্থী ও পর্যটক আগমন সংখ্যা আরও বাড়বে।

 

একই এলাকার শিক্ষার্থী মিথিলা চানু বলেন, মণিপুরিদের ইতিহাস ঐতিহ্য সংবলিত এ জাদুঘর থাকায় আমরা অনেক কিছু জানতে পারি এখানে এসে। আমাদের পূর্বসুরীদের জীবন ও তাদের বীরত্বগাথা জানতে পারি। আমাদের সমৃদ্ধ একটা জাদুঘর থাকায় আমরা গর্বিত।

 

মনিপুরী ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে এওয়ার্ড প্রাপ্ত মণিপুরি কবি সনাতন হামোম জানান, সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায়, নিজ অর্থায়নে হামোম তনু বাবু চালিয়ে যাচ্ছেন তার মনিপুরী সংগ্রহশালা। এই জাদুঘরের মাধ্যমে তিনি ইতিহাস ঐতিহ্য ও  সাংস্কৃতিক উপাদান ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশ বিদেশ থেকে আগত পর্যটক জাদুঘরে স্থান পাওয়া ২৭০ প্রকারের ৩ শতাধিক মনিপুরী সামগ্রী দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। এই জাদুঘরটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক করা সময়ের দাবি। এই জাদুঘর এর মধ্যে দিয়ে মনিপুরিরা যেমন সমৃদ্ধ হবে তেমনি উপকৃত হবে সকল নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী।

জাদুঘরটি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি সরকারি পৃষ্টপোষকতার কথা জানিয়েছেন ডিসি মীর নাহিদ আহসান।

 

জাদুঘরটি পরিদর্শন করে ডিসি বলেন, বাস্তবিক অর্থে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মনিপুরীদের এমন একটি সংগ্রহশালা আমাদের একদিকে প্রাণিত করে অন্যদিকে দায়বদ্ধও করে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত  অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, এখানে সকল জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও অধিকার সংরক্ষণে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। আমাদের সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য, তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধিনে একটি সেল কাজ করছে। এই সেলের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নের কাজ করছি। স্থানটি পরিদর্শন করেছি, তাদের দাবি ছিলো জাদুঘর এর জন্য একটি ভবন নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেছি, এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন পাঠানো হবে।আশা করি আবেদন গ্রহণ করার পরপরই ভবন নির্মাণ করে দিতে পারবো।


সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com