যেভাবে চীন ‘অলৌকিক অর্থনীতি’ হয়ে উঠলো

প্রকাশিত: ১:১৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৯

যেভাবে চীন ‘অলৌকিক অর্থনীতি’ হয়ে উঠলো

এক সময়কার খুবই দরিদ্র ও পশ্চাৎপদ দেশ চীন ৭০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর পূর্তি চীনে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে।

জাতীয়তাবাদী শক্তির সাথে গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর কমিউনিস্ট নেতা চেয়ারম্যান মাও জেদং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তারপর থেকে গত সাত দশকে দেশটিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। নজিরবিহীন সম্পদ অর্জন করেছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। চীন আজ শুধু এশিয়া মহাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেও পরাক্রমশালী এক রাষ্ট্র।

একজন গবেষক ও চীনা অর্থনীতিবিদ ক্রিস লিয়ং বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি যখন চীনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তখন দেশটি খুবই গরিব একটি দেশ ছিল। ব্যবসা করার জন্যে তাদের কোনো অংশীদার ছিল না, কারো সাথে ছিল না কূটনৈতিক সম্পর্ক, তারা শুধু তাদের নিজেদের উপরেই নির্ভরশীল ছিল।

গত ৪০ বছরেও বেশি সময় ধরে চীন তাদের বাজার অর্থনীতিতে একের পর এক যুগান্তকারী সংস্কার ঘটিয়েছে, ব্যবসা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্যে নতুন নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্রের কবল থেকে বের করে এনেছে।

বিংশ শতাব্দীতে মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ যতো ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১৯৫০’র দশককেও বিবেচনা করা হয়।

মাও জেদং সেসময় খুব দ্রুত চীনের কৃষি অর্থনীতিকে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার এই কর্মসূচি গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড নামে পরিচিত।

মাও জেদং’র এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায় এক থেকে চার কোটি মানুষ।

এরপর ৬০’র দশকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে চীনের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে মুক্ত করতে তিনি এই বিপ্লবের সূচনা করেন। কিন্তু এর ফলে সমাজের অনেক বিষয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সারা বিশ্বের কারখানা : ১৯৭৬ সালে মাও জেদং এর মৃত্যুর পর দেং শিয়াওপিং’র শাসনামলে চীনের বিভিন্ন খাকে সংস্কারের কাজ আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। নতুন করে গড়ে উঠতে শুরু করে দেশটির অর্থনীতি।

কৃষকদেরকে তাদের নিজেদের জমি চাষাবাদের অধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে তাদের জীবন-মানের উন্নয়ন ঘটতে ও খাদ্যের ঘাটতিও কমে আসতে শুরু করে।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্যে চীনের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে গড়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক। সস্তা শ্রম ও অল্প খরচের কথা মাথায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অর্থ ঢালতে শুরু করে।

‘১৯৭০ সালের দশকের শেষ দিক থেকে তার পরের সময়ে আমরা দেখি যে বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে চীনের অর্থনীতি এক অলৌকিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে,’ বলেন ডেভিড মান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আন্তর্জাতিক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

এর পরে ১৯৯০ সালের পুরো দশক ধরেই চীনে খুব দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। দেশটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয় ২০০১ সালে। চীনের জন্যে এটিও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অন্যান্য দেশের সাথে চীনের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব বাধা ও শুল্ক ছিল সেগুলোও ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায় যে বিশ্বের সর্বত্র চীনের পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেভিড মান বলেন, চীন যেন সারা বিশ্বের জন্যে একটি ওয়ার্কশপ বা কারখানায় পরিণত হয়।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে ১৯৭৮ সালে চীনের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার যা ছিল বিশ্ব বাণিজ্য থেকে মাত্র এক শতাংশ কম। এর পর থেকে চীনের রপ্তানি আরও দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। ১৯৮৫ সালের মধ্যে দেশটির রপ্তানির পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি ডলারে পৌঁছে যায় এবং তার দুই দশকেরও কম সময় পর এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। পণ্য রপ্তানির বিচারে চীন পরিণত হয় বিশ্বের বৃহত্তম দেশ হিসেবে।

দারিদ্র হ্রাস : অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে চীনে কোটি কোটি মানুষের সম্পদও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এই সময়কালের মধ্যে চীনে ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষকে দারিদ্রের কবল থেকে মুক্ত করা হয় এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে চরম দারিদ্র বলে কিছু থাকবে না।

একই সাথে শিক্ষার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বলছে, চীনে যে কর্মশক্তি আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের ২৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা অর্জন করবে, যা হবে আজকের জার্মানির সমান।

অসাম্য বাড়ছে : তারপরেও অর্থনৈতিক এই সাফল্যের সুফল ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনে সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।ধনকুবেরের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও তার পাশাপাশি দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও।

বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে খুব বেশি দক্ষতা নেই এমন মানুষের হিসেবও। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীরে চলে গেছে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে এই বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট।

‘গোটা অর্থনীতি খুব একটা অগ্রসর হয়নি, বিভিন্ন অংশের মধ্যে এখনও বড় ধরনের পার্থক্য রয়ে গেছে,’ বলেন ডেভিড মান।

বিশ্ব ব্যাংক বলছে, মাথাপিছু আয়ের হিসেবে চীন এখনও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাতারেই রয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় চীনাদের এই আয় এক চতুর্থাংশেরও কম।

ডিবিএস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান বলছে, চীনের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ১০,০০০ ডলার যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক আয় ৬২,০০০।

শ্লথ প্রবৃদ্ধি : বর্তমানে চীন শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করতে চলেছে। বহু বছর ধরেই চীন চেষ্টা করছে রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে ভোক্তা-নির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে জোর দিতে। ফলে দেশটির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে চীনা পণ্যের ব্যাপারে সারা বিশ্বের চাহিদা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য-যুদ্ধ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনে প্রবৃদ্ধির হার যদি ৫ থেকে ৬ শতাংশেও এসে দাঁড়ায়, তারপরেও বিশ্বের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্যে দেশটি সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ : বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ। এরকম একটি প্রকল্প হচ্ছে ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ যা এ যুগের সিল্ক রোড নামেও পরিচিত। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বের অর্ধেক জনগণকে একসাথে যুক্ত করা।

ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে সারা বিশ্বে বাণিজ্য বিনিয়োগের পরিমাণ অভাবনীয় আকারে বৃদ্ধি পাবে। খবর : বিবিসি বাংলা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com