প্রচ্ছদ

যৌন আবেদন জর্জেট বোরখা দিয়েও সৃষ্টি করতে পারেন, শাড়ির দোষ দিচ্ছেন কেন?

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৩৩

রিফাত মুনির
রিফাত মুনির, শিক্ষক ও লেখক: ছবি সংগৃহীত

সায়ীদ স্যারের শাড়ি বিষয়ক লেখা পড়লাম, আমি অন্য সবার মতো তার বাঙালি মেয়েদের উচ্চতা বিতর্কে যাব না। তবুও শাড়ি নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে।

শাড়িকে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক বলার কারণ সম্ভবত এর ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার। এদেশে, আমার মতো যারা মধ্য চল্লিশের, তারা নানুমা, দাদী, ফুপু, খালামনি সবাইকে শাড়ি পরা দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন একটা সময়। এখনো একটা সংস্কার হোক, বা অন্য কিছু, তারা শাড়ি আঁকড়ে আছেন। মা’র আঁচলের ঘ্রান পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা সুগন্ধি, কারন তা তৈরি হয় ভালবাসা আর মমতা দিয়ে।

এবার আসি পোশাকের বিবর্তন নিয়ে। বাঙালি সমাজে নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে সালোয়ার কামিজের প্রচলন, ২০০০ সালের পর থেকে, আমার দেখা, রাজধানীতে ষাটোর্ধ মহিলাদের এমনকি শতকরা সত্তর ভাগ সালোয়ার কামিজ পরার চেষ্টা করেছেন, আজো করেন। তাদের তাতে যেমনই দেখাক না কেন!

দিনবদলের সাথে সাথে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। একারনেই অফিসগামী কর্মজীবি মহিলাদের শাড়ি পরার হার কমে গেছে। মেয়েরা প্রতিদিন নানান কাজের ফাঁকে শাড়ি পরার সময়টুকু বের করতে পারছে না। এর প্রধান কারন মেয়েরা শাড়িকে কষ্টসাধ্য এবং ভালভাবে সামলাতে পারার অক্ষমতা কে বড় করে দেখছে।

পাঠক, এটা হতেই পারে। একজন মানুষ তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরবেন, তা শার্ট প্যান্ট, সালোয়ার কামিজ, কুর্তা, লেগিংস, পালাজ্জো, চুড়িদার যা খুশি। তার কাছে যা সহজ, আর স্বচ্ছন্দ তাই তিনি বেছে নিতে পারেন। তাতে কারো আপত্তি নেই, থাকার কথাও নয়। আমার আপত্তি শাড়ি না পরার পেছনে কিছু বানানো তথাকথিত হাস্যকর যুক্তি খুঁজতে যাওয়া। আমার অক্ষমতা, অনীহা ও অলসতার দায় বেচারি শাড়ি কে নিতে হচ্ছে!

আরেকটা কথা, আমাদের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশের আবহাওয়া ও ভৌগলিক পার্থক্য খুব কমই বলা যায়। অথচ, এই পশ্চিমবঙ্গে চল্লিশোর্ধ কর্মজীবী নারীর শতকরা নব্বই ভাগ শাড়ি পরেন, বাস, ট্রাম, অটোতে চলতে তাদের সমস্যা হয়না। শিশু সন্তানকে কোলে বাইসাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পার হওয়া রমনী পশ্চিম বঙ্গের আশেপাশের জেলাগুলোর এক স্বাভাবিক দৃশ্য।

অন্যদিকে, কথায় কথায় ধর্মকে টেনে আনা বাঙালির স্বভাব। শাড়িকে যৌন আবেদনময়ী পোশাক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে এর ব্যবহার ও প্রচলন কমে যাবে, এটাই সম্ভবত তাদের আশা। আমার মাথায় ঢোকেনা যৌন আবেদন তো আপনি খুব স্বচ্ছ জর্জেট বোরখা দিয়ে ও সৃষ্টি করতে পারেন। দায়ী কে? বোরখা? না আপনি? শাড়িকে দোষ দিয়ে খুব সহজেই আমরা কি ব্যক্তি মানসের বিকৃত রুচি ও মানসিকতাকে পাশ কাটাচ্ছি না?

ষাট, সত্তর আর আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে নারী লাঞ্ছনার হার বৃদ্ধিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, পোশাক না, যৌনহয়রানির পেছনে মানসিকতাই দায়ী।

আপনি বলবেন কতটা ঘটনা আর মিডিয়া তে আসে? কথা ঠিক। কিন্তু, একবার ভাবুন তো সিমি, রুমি, ফাহিমা, পিংকী, তনু, নুসরাত এইসব নিষ্পাপ মেয়েগুলো কখন কোথায় শাড়ি পরে তথাকথিত “যৌনআবেদন” সৃষ্টি করলো? তবুও তাদের মরতে হলো কেন? এত নৃশংসভাবে?

পাঠক, আবারো বলছি, আমি শাড়ি পরার পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছি না, আপনার যা ইচ্ছে পরবেন, কিন্তু প্লিজ শাড়িকে সব অপবাদ থেকে মুক্ত রাখুন। শাড়ি থাকুক দায়মুক্ত!

লেখাটা লেখার সময় কণ্ঠশিল্পী বিশ্বজিতের কন্ঠ বাজছিল কানে: “আলতা শাড়ি পরিলে মনে পইড়া যায়, একদিন বাঙালি ছিলাম রে!” ফেসবুক স্ট্যাটাস

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com