প্রচ্ছদ

লোভাছড়ায় পাথর খেকো চক্রের তান্ডবলীলা অব্যাহত

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:৫৯

মুমিন রশিদ, কানাইঘাট
সিলেটের কানাইঘাট লোভাছড়া কোয়ারীতে গভীর গর্ত করে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলছে পাথর উত্তোলন।

সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথর কোয়ারীর পর আরেকটি হল কানাইঘাটের সিমান্তবর্তী লোভাছড়া পাথর কোয়ারী। লোভা নদীর প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে এ পাথর কোয়ারী অস্থিত্ব।

সরকারী ভাবে সিলেটের অন্যান্য পাথর কোয়ারীর লীজ এ বছর বন্ধ থাকলেও মাস খানেক পূর্বে একজন পাথর শ্রমিকের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাই কোর্টের একটি ব্যাঞ্চ শুধু মাত্র পাথর শ্রমিকদের কোয়ারী থেকে যান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়া পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করেন। কোয়ারী থেকে উত্তোলনকৃত পাথর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ও রয়েলিটি আদায় সংক্রান্ত রিটে কোন ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এ আদেশে।

কিন্তু রিটের আদেশ ও স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কোয়ারী জুড়ে চলছে পাথর উত্তোলনের নামে ধ্বংসলীলা।

মূলত; পাথর শ্রমিকের এ রিটকে পুঁজি করে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ ভাবে পাথর কোয়ারীর পূর্বের নিয়ন্ত্রণকারীরা সেখানে রামরাজত্ব কায়েম করেছে। অবৈধ ভাবে দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রশাসনের অগোচরে লক্ষ লক্ষ টাকার রয়েলিটি আদায় ও কোয়ারীতে পাথরের গর্ত ও দখল সংক্রান্ত পুঁজি করে প্রভাবশালী চক্রটি ইতিমধ্যে কোটি টাকা পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন কোয়ারী এলাকায় পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ঘটছে নানা ধরণে অপ্রিতিকর ঘটনা।

লোভা নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি কেটে ও বড় বড় গর্ত করে চলছে পাথর উত্তোলনের মহোৎসবের ফলে নদীর প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা গতিপথ একেবারে ভরাট করে দিয়েছে পাথর খেকু চক্রটি। পেশীশক্তির মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা যে, যার মতো পাথর উত্তোলন করছে। স্থানীয় প্রশাসন কোয়ারীতে অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধে অভিযান করে থাকলেও খবর পেয়ে পাথর ব্যবসায়ীরা তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে ছিটকে পড়েন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা চলে আসার পর সাথে সাথে আবার পাথর উত্তোলন শুরু হয়। সন্ধ্যা নামার শুরু থেকে ভোর পর্যন্ত চলে পাথর কোয়ারীতে ধ্বংসলীলা।

শতাধিক স্কেভেটর, ফেলোডার দিয়ে পাথর তোলার নামে বিশাল বিশাল গভীর গর্ত তৈরী করা হয়। শত শত শেলো মেশিন, বেলাই বোমা মেশিনের সাহায্যে পরিবেশ বিধ্বংস করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও মসজিদ হুমকির মুখে রয়েছে।

সরেজমিনে কোয়ারী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লোভা নদীর ভালুকমারার চর, সাউদগ্রাম, বাংলো টিলা, কান্দলা, তেরহালি, বাজেখেল ও মেছারচর এলাকা হল পাথর উত্তোলনের মূল স্পট। এ স্পটগুলোতেই অপ্রতিরোধ্যভাবে চলছে স্কেভেটর, শেলো মেশিনের সাহায্যে ৫০-১০০ ফুট গর্ত করে পাথর উত্তোলন। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালালেও আমলে নিচ্ছেন না পাথরখেকোরা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ পাথর কোয়ারী নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় ১নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি তমিজ উদ্দিন মেম্বার, প্রচার সম্পাদক আহাদ হোসেন, ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি হাজী বিলাল আহমদ, গিয়াস উদ্দিন, কানাইঘাট থানা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম, থানা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক শফিকুর রহমান মেনন, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সাউদগ্রামের হাজী কামাল উদ্দিন, মাতাই মিয়া, সিরাজ উদ্দিন, ইসলাম উদ্দিন, মুহিবুর রহমান, কান্দলা গ্রামের আব্দুল্লাহ চৌধুরী, সোহেল চৌধুরী, ইসলাম উদ্দিন, নজরুল মিয়া, বাজেখেল গ্রামের শামসুদ্দিন, ডাউকেরগুল গ্রামের তাহের, শাহাবুদ্দিন। এরা হলেন, কোয়ারীর হর্তা-কর্তা।

এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, গত ৫-৭ বছরে লোভা নদীর দু’তীরের প্রায় দুই একর করে ফসলি জমি কেঁটে ও গর্ত করে নদীর সাথে বিলীন করা হয়েছে। দূর থেকে দাঁড়ালে মনে হবে এটা কোন মরুভূমি। তেরহালি ও সাউদগ্রামের চরে তমিজ মেম্বার, শাবউদ্দিন, সিরাজউদ্দিন, হাজী বিলাল, হাজী কামাল উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, ফারুক আহমদ, তাজির উদ্দিন, হাফিজ আহমদ, সোহেল চৌধুরী, সমছুদ্দিন ও মাতাই মিয়া, দক্ষিণ লক্ষী প্রসাদ গ্রামের কামাল উদ্দিন, তমিজ উদ্দিনদের একাধিক গর্ত রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের আবার স্কেভেটর ও শেলো মেশিন রয়েছে। তমিজ উদ্দিন মেম্বার গর্ত করার জন্য ১৪টি স্কেভেটর দিয়ে কাজ করছেন বলে জানা যায়।

ভালুকমারার চরে ফখরুল আলম, মুহিবুর রহমান, নাজিম উদ্দিন, আবু তাহের, শাবুদ্দিন, ইলাছ উদ্দিন, ছাত্তার, মোহাম্মদ, স্বপন, গনি, শাহীদ, সফর, মজির উদ্দিন, কান্দলা ও বাজেখেল চরে আব্দুল্লাহ, আলমাছ মোহাম্মদ, মারুফ আহমদ, জুবায়ের আহমেদ, সফর আলী, বিলাল আহমদ, শরিফ উদ্দিন, সতিপুর চরে আহাদ হোসেন, নূরুল আমিন, আফজল হোসেন, শামীম আহমদ, নিজাম উদ্দিন, আব্দুল বাছিত, আবুল বাশারসহ দুই শতাধিক ব্যবসায়ীর একাধিক গর্ত রয়েছে। এছাড়াও নদীর তীর কাটা ও গর্ত করার জন্য জুবায়ের মিয়া, লাল মিয়া, আব্দুল্লাহ, সোহেল চৌধুরীর একাধিক স্কেভেটর এখানে রয়েছে। পাথর উত্তোলনের সময় মাটি চাপা পড়ে অনেকের মৃত্যু ঘটে। আহত হন অসংখ্য শ্রমিক। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা হতাহতের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দিয়ে থাকেন।

গত বছর অন্তত ১০জন শ্রমিক মারা যান। আহত হন শতাধিক। এ হতাহতের ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালালেও আমলে নিচ্ছেন না স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর বাংলো টিলা এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের সময় টিলা ধ্বসে ৫ শিক্ষার্থীসহ ৬ জনের মৃত্যু ঘটে।

এছাড়াও প্রায় সময় কোয়ারী এলাকায় মাটি চাপা ও ট্রাক্টর থেকে পড়ে আহত হন শ্রমিকরা।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, কোয়ারীতে শ্রমিকদের মধ্যেও পাথর উত্তোলন নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে থাকে। এতে অনেকে আহত হলেও ব্যবসায়ীরা বিষয়টি গোপন রাখেন। পাথর উত্তোলনের জন্য মেছারচর দখল নিয়ে লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ন ও লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। দখল-পাল্টা দখল নিয়ে উভয় ইউনিয়ন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।

সিলেট জেলা বারের আইনজীবী এডভোকেট মামুন রশীদ বলেন, বৃহত্তর সিলেটের সম্পদ প্রকৃতিকন্যা লোভা পর্যটন স্পট ও সাধারণ শ্রমিকদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

নানা শ্রেণী পেশার আরো অনেকে জানিয়েছেন, যে ভাবে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলা ভূমি লোভা নদীর বুক চিরে ও দুই পাড় ভেঙ্গে নির্বিচারে প্রভাবশালীরা সম্পদশালী হওয়ার জন্য পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে। যা অচিরেই এলাকায় মারাত্বক পরিবেশ বির্যয় নেমে আসবে। শুধু অভিযান নয় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃশ্যমান আইন আনুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কোয়ারীতে বেআইনি তৎপরতা রোধ করা সম্বব হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন।

স্থানীয় লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউপির চেয়ারম্যান ডা: ফয়েজ আহমদ বলেন, সরেজমিনে কোয়ারীর ভয়াবহ গর্ত দেখে ভয়ঙ্কর লেগেছে। যে কোন সময় আবারো প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

কোয়ারীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী লোভাছড়া আদর্শ পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী তমিজ উদ্দিন মেম্বার, মুলাগুল পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক সিরাজ উদ্দিনের সাথে বিভিন্ন সময় কথা হলে তারা বলেন, আমাদের সহ স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোয়ারীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা ভাবে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা পাথর ব্যবসা করে থাকি বিধায় অনেকে ইনিয়ে বিনিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নানা প্রগাডাঙ্গায় লিপ্ত রয়েছে।

কোয়ারীতে অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলনের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে লোভাছড়া কোয়ারী থেকে অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। যান্ত্রিক বাহনের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। ইতিমধ্যে অবৈধ ভাবে পাথরবাহী যানবাহন থেকে রয়েলিটি আদায় বন্ধ এবং অনেক পাথর অন্যত্র বিক্রির চেষ্টা কালে আমরা আটক করে জব্দ করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com