সিলেটসহ সারাদেশে ১৫ হাজার হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অনুমোদন ৪১৬৪টির

প্রকাশিত: ২:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

সিলেটসহ সারাদেশে ১৫ হাজার হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অনুমোদন ৪১৬৪টির

সুরমা মেইল ডেস্ক : সারাদেশে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১৫ হাজার। এরমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন আছে মাত্র ৪ হাজার ১৬৪টির। অবশিষ্ট ১০ হাজার ৮৩৬টির কোন অনুমোদন নেই। লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন এসব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার নামে চলছে প্রতারণা ও রোগী হয়রানি। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি হাসপাতালের প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা গেছে, দেশে প্রাইভেট হাসপাতালের অনুমোদনের জন্য অধিদফতরে আবেদন জমা পড়েছে ১০ হাজার ৯৪০টি। এরমধ্যে ঢাকায় আবেদন জমা পড়েছে ৩ হাজার ৭৭টি। বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হাসপাতাল ১ হাজার ৬৫৪টি। অন্য আবেদনগুলো এখনও তদন্ত পর্যায়ে আছে।

 

বিভাগীয় পর্যায়ে আবেদনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে প্রাইভেট হাসপাতালের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২ হাজার ২২৭টি। বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৭০৩টি। অন্যগুলো তদন্ত পর্যায়ে। রাজশাহী বিভাগের প্রাইভেট হাসপাতালের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১৫৮৫টি। তারমধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৭৫৪টি। অন্যগুলো তদন্ত পর্যায়ে। রংপুরে আবেদন জমা পড়েছে ৮৪১টি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১১৯টি। অন্য আবেদনগুলো তদন্ত পর্যায়ে।

 

খুলনা বিভাগে লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১৪৭৩টি। বর্তমানে লাইসেন্স আছে ৩৯১টি। বরিশাল বিভাগে আবেদন জমা পড়েছে ৬৫৮টি। বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ২৭৪টি।

সিলেট বিভাগে হাসপাতালের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ৪৪৮টি। বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১৯৩টি। অন্যগুলো তদন্ত পর্যায়ে আছে। ময়মনসিংহ বিভাগে প্রাইভেট হাসপাতালের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ৬৩৮টি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৭৬টি। অন্যগুলো তদন্ত পর্যায়ে আছে।

 

এদিকে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে গত ২১ জুলাই রাজধানীর শ্যামলী ঢাকা ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড স্পেশালাইজড হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কারণ দর্শানো নোটিস দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিদর্শন কমিটি গত ১৮ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। তারা হাসপাতালের কোন লাইসেন্স প্রদর্শন করতে পারেনি। অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায় হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৮ সালের ৩০ জুনের আগেই শেষ হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা শর্তেও কোন প্রকার মূল্য তালিকা উন্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করা হয়নি। পরিদর্শনকালে শয্যা সংখ্যা পাওয়া যায় ২৬টি (আইসিইউ ব্যতিত)। শয্যা সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি দেখা গেছে। আইন অনুযায়ী প্রতি শিপটে কমপক্ষে ৩ জন চিকিৎসক, ৬ জন নার্স থাকা দরকার। তারমধ্যে মাত্র একজন চিকিৎসক পাওয়া গেছে। কোন নার্সিং কাউন্সিল কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনের প্রাপ্ত নার্স পাওয়া পাওয়া যায়নি।

 

১৯৮২ সালের প্রাইভেট হাসপাতাল অর্ডিন্যান্সের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিল সংক্রান্ত বিবরণীতে কোন সার্ভিসের কত মূল্য তা উল্লেখ করা হয়নি। এ সংক্রান্ত অনিয়মের সম্ভবনা রয়েছে। হাসপাতালের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। বিপজ্জনকভাবে অক্সিজেন রাখা হয়েছে। আইসিইউতে তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। হাসপাতালটি আইসিইউ পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। হাসপাতালটির লাইসেন্স হাল নাগাদ নবায়ন না করা পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না তার সুস্পষ্ট জবাব আগামী ৭ দিনের মধ্যে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। গত ২১ জুলাই এ কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়।

 

এ সম্পর্কে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মবিন খানের সঙ্গে তার মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি। তাই তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা গেছে, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত নতুন প্রায় ২ হাজার প্রাইভেট হাসপাতাল এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় (পাইপ লাইনে) আছে। প্রয়োজনীয় কাজ চলছে।

 

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা দিয়ে অনুমোদন অপেক্ষা না করে আগেই কাজ শুরু করে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতালের বিরুদ্ধেই অনিয়ম, প্রতারণা ও অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষা থেকে অপারেশন, আইসিইউতে রোগী রাখাসহ সব কিছুতে অনিয়ম। দুই-একটি হাসপাতাল ছাড়া অধিকাংশই অর্থ বানিয়ে নেয়ার নানা অপকৌশল প্রয়োগ করে।

 

এক বছর পর পর নবায়ন করতে হয় হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স। অনেকেই তা করে না। প্রাইভেট হাসপাতালের লাইসেন্সের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রসহ নানা কাগজ জমা দিতে হয়। এসব কাগজপত্র অনেকে দিতে না পারলেও তারা তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল চালু করে দেয়।

 

এ সম্পর্কে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, আইনকে অমান্য করা একটা কালচারে পরিণত হয়েছে। যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে ঠিকমতো তদারকি করে না। এ সুযোগে সরকারের ফি ফাঁকি দেয়াসহ তারা নানা অনিয়ম করছে। প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতালে প্রকারভেদে ২৫ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হয়। অনেকেই এটাও দেয় না। শুধু তাই না। হাসপাতালের প্রতি ১০ জন রোগীর জন্য ৩ জন ডাক্তার, ৬ জন নার্স ও ৩ জন ক্লিনার রাখতে হয়। ১৯৮২ সালের প্রাইভেট হাসপাতালের অর্ডিন্যান্সে এমন তথ্য থাকলেও বাস্তবে কিছুই মানা হয় না।

 

বিশিষ্ট আইসিইউ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে অবশ্যই লাইসেন্স হালনাগাদ করতে হবে এবং হালনাগাদ থাকাও উচিত। আর হালনাগাদের প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। লাইসেন্স করতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬টি সংস্থার ছাড়পত্র লাগে। আর স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আরও গতিশীল হতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের ইনস্পেকশন করে রিপোর্ট হালনাগাদ করা দরকার। হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরি, পরীক্ষাগার, অপারেশন থিয়েটার সব কিছু মানসম্মত কিংবা তদারকির পর ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

 

নিউরো স্পাইন সোসাইটি অফ বাংলাদেশের সভাপতি প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ হোসেন বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে প্রথমত অবশ্যই লাইসেন্স থাকতে হবে। চিকিৎসকরা রোগী দেখতে যেমন বিএমডিসির অনুমোদন লাগে। তেমনি লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল চালুর অনুমোদনও বন্ধ রাখতে হবে। আর সেখানে চিকিৎসক নার্স হিসেবে যারা কাজ করবেন তাদের লাইসেন্সসহ অন্যান্য সুবিধা আছে কিনা তা জেনেই কাজ করতে হবে। আর অনেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ভালো উন্নতমানের আবার অনেক হাসপাতালের নিম্নমানের। তা সরকারের অবশ্যই তদারকি করে মান উন্নত করা- এতে রোগীরাও যথাযথ চিকিৎসা পাবে এবং দেশের চিকিৎসা সেবারও মান আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞের অভিমত।

 

এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, দেশের অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল নিয়ম-কানুন মানে না। স্বাস্থ্যসেবা সার্ভিসের জন্য এটা দুর্ভাগ্যজনক। কেউ কেউ আছে লম্পট। তারা প্রতারক সাহেদের মতো হাসপাতাল করে চিকিৎসা নিয়ে চরম প্রতারণা করছে। এ সব প্রাইভেট হাসপাতালের সরকারের কঠোর নজরদারি থাকা উচিত।

 

অন্য একজন চিকিৎসক বলেন, হাসপাতাল নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয়। হাসপাতাল হবে চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোন কিছু করা ঠিক হবে না। যারা চিকিৎসার নামে প্রতারণা করবে দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

 

মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ও কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে দেশজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ তদন্ত টিম সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কোন কোন প্রাইভেট হাসপাতালে করোনাভাইরাস টেস্টসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন। প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতালের দুর্নীতি তদন্তে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করছেন। সম্প্রতি রাজধানীর যে কয়টি প্রাইভেট হাসপাতালে অনুসন্ধান করে অনিয়ম পাওয়া গেছে সে সবের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অধিদফতরের তদন্ত অব্যাহত আছে। অন্যান্য সংস্থাও প্রাইভেট হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করছে। লাইসেন্স নবায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালের নবায়নের কাজও চলছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ২শ’ হাসপাতাল নবায়ন করা হয়েছে।

 

পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, যারা হাসপাতাল করতে লাইসেন্স দেয়। তারা আবেদনকারীদের নানাভাবে হয়রানি করে। আর অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল তদন্ত ছাড়াই অনুমোদন দেয়া হয়। এ জন্য লাইসেন্সধারীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত। না হলে অনিয়ম বন্ধ হবে না। জাল জালিয়াতি চলতে থাকবে। অনিয়ম ঠেকাতে আগে স্বাস্থ্য সেক্টরের অনিয়ম দূর করতে হবে। যে শর্ত দেয়া হয়, শর্ত পূরণ করতে গেলে সেখানে পদে পদে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার বলে পুলিশের এ অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

 

অপরাধবিষয়ক বিশিষ্ট আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, যারা প্রাইভেট হাসপাতাল করার অনুমতি দেয়। তাদের অবৈধ কাজেরও সুযোগ করে দেয়া হয়। উভয়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

 

এ সম্পর্কে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, যে সব প্রাইভেট হাসপাতালের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সে সব হাসপাতালের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রমাণসাপেক্ষ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত রিজেন্ট সাহাবউদ্দিন মেডিকেল হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তাদের জালিয়াতি ও করোনা টেস্ট রিপোর্ট জালিয়াতি, অপারেশন থিয়েটারে মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল আইটেম ব্যবহারসহ নানা অনিয়ম উদ্ঘাটন করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলমান আছে। র‌্যাবের এ অভিযান সফল হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রশংসা করছেন। জালিয়াত প্রতারক সাহেদ ধরা পড়ার ফলে অন্য হাসপাতালের জালিয়াতি ও অনিয়ম নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com