১০৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ, মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা ২৬ মার্চ

প্রকাশিত: ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

১০৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ, মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা ২৬ মার্চ

Manual7 Ad Code

সুরমা মেইল ডেস্ক : সরকারের হাতে থাকা নথির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর বেতনভোগী ১০ হাজার ৭৮৯ জন স্বাধীনতাবিরোধীর প্রথম তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

 

মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেফাজতে থাকা দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম তালিকা রোববার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।

 

রোববার (১৫ ডিসেম্বর) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সন্ত্রমহানি করেছে।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীর মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হল বলে জানান মন্ত্রী।

 

তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি।’

 

তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি-না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে রিঅ্যাকশনটা দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে।’

 

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েকটি রাজনৈতিক দল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী।

 

তখন যুদ্ধরত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করতে রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়েছিল। আনসার বাহিনীকে এই বাহিনীতে একীভূত করা হয়েছিল।

 

প্রথমে এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গঠিত শান্তি কমিটির অধীনে থাকলেও পরে একে আধা সামরিক বাহিনীর স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার।

 

একই রকম আধা সামরিক বাহিনী ছিল আল বদর বাহিনী ও আল শামস বাহিনী। তবে স্বাধীনতাবিরোধী এই বাহিনীগুলোকে সাধারণ অর্থে রাজাকার বাহিনী হিসেবেই পরিচিত বাংলাদেশে।

 

Manual5 Ad Code

প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই।

 

তবে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে।

Manual5 Ad Code

 

এরপর গত ২৫ অগাস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহে কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়।

 

বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছর ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ওই তালিকা করার জন্য আবারও তাগিদ দেওয়া হয়।

 

Manual2 Ad Code

কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।’

 

এর ধারাবাহিকতায় বিজয় দিবসের আগের দিন ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করতে এসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, “বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তৎকালীন ১৯ জেলার রেকর্ড রুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; আশারুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলেছি।”

 

বিভিন্ন জেলার রেকর্ড রুম এবং ওই সময় বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশ করা হবে।’

 

এক প্রশ্নে মোজাম্মেল বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তার বিশ্বাস। তবে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে।

 

মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় যারা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তারাও স্বাধীনতাবিরোধী।

 

মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা ২৬ মার্চ

সব ধরনের তালিকা যাচাই-বাছাই করে আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

 

রোববার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার প্রাথমিক খসড়া আমাদের কাছে রয়েছে। বর্তমান তথ্যমতে, কোনো না কোনো তালিকায় অর্ন্তভুক্তির সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন। এর মধ্যে দাবিদার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ জন।’

 

বর্তমানে ২ লাখ ১ হাজার ৪৬১ জন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন জানিয়ে মোজাম্মেল বলেন, ‘একজনের নাম একাধিক দলিলে রয়েছে। এজন্য মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি নয়।’

 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জানান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম পাঁচ জায়গায় রয়েছে। যাদের নাম একাধিক তালিকায় রয়েছে তা বাদ দেওয়ার কাজ চলছে। একই নাম একাধিক বানানে লেখার কারণে একাধিকবার সেসব নাম ছাপা হয়েছে।

 

মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছায়ের প্রক্রিয়া তুলে ধরে মোজাম্মেল হক বলেন, এর আগে আইন লংঘন করে ৪৪ হাজার জনকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরে আইনের মধ্যে তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

 

স্বাধনীতার পর গত ৪৮ বছরে ছয়বার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ড পাল্টেছে ১১ বার।

Manual8 Ad Code

 

সর্বশেষ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ‘প্রকৃত’ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, আবেদনকৃত ও তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীক্ষণ এবং তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে উপজেলা, জেলা/মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটি করেছে সরকার।

 

এ কাজে চারটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ঠিক হয়, ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা, বেসামরিক গেজেট ও বাহিনীর গেজেট- এই চারটি তালিকার অন্তত একটিতে নাম থাকলে তবেই একজন ব্যক্তির নাম আসবে চূড়ান্ত তালিকায়।

 

এরপর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত করতে সরকার সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে। কিন্তু আইনি জটিলতায় অনেক কমিটির প্রতিবেদন তৈরি হতে সময় লেগে যায়।

 

আবার অনেক কমিটির প্রতিবেদনে অসঙ্গতি ও ভুলত্রুটি থাকায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আপত্তি আসায় অসঙ্গতি দূর করতে গঠন করা হয় আরেকটি কমিটি।

 

আওয়ামী লীগের গত মেয়াদের শেষ বছর ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে ঘোষণ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক। কিন্তু নান জটিলতায় তা আর হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code