বিচ্ছিন্নতা একটি রোগ: তুষার আবদুল্লাহ

প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০১৬

বিচ্ছিন্নতা একটি রোগ: তুষার আবদুল্লাহ

কলাম : ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে প্রথমে নিখোঁজ, পরে লাশ উদ্ধার দৃক কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলামের। ইরফানকে জানি এক যুগেরও বেশি। নিরীহ, গোবেচারা এই মানুষটিকে টাকা ছিনতাইয়ের জন্য মেরে ফেলা হয়েছে বলে আপাত সবার ধারণা। পুলিশ বলছে পেশাদার খুনিরা তাকে হত্যা করেছে। বলছে, কিন্তু কাউকে আটক করতে পারেনি। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে অপহৃত, তারপর লাশ উদ্ধারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র।

তনু টিউশনিতে গিয়ে ছিল। বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার। তাকেও হত্যা করা হয়। যদিও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বলছে-তনুর মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। রাষ্ট্রের কাছে ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বিষয়। একটি মেয়ে বাসে করে বাড়ি ফিরছিল। বাসেই তাকে বাসের চালক, হেলপার ধর্ষণ করে। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় এটিও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দুই প্রভাবশালী নেতাকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হয় এক ছাত্র। সপ্তাহ না গড়াতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ব্লগার নিজামউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা। দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের পর দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৫ জন নিহত। নির্বাচনের ব্যাপকতায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা এটিও।

শিয়া মসজিদে ঢুকে মুয়াজ্জিন হত্যা। ইতালীয় নাগরিক হত্যা। কাদিয়ানি মসজিদে হামলা। মুক্তিপনের দাবিতে অপহরণ। দাবি না মেটাতে পারায় লাশ হয়ে যাওয়া। পুলিশ বা গোয়েন্দা পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া। তারপর আর ঘরে ফিরে না আসা। বিচ্ছিন্ন ঘটনার ডায়েরিতে অদৃশ্য কালিতে লিখে রাখা হচ্ছে।

‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ এই শব্দ যুগলের সঙ্গে পরিচয় সদ্য নয়। যখন থেকে গণমাধ্যমের শ্রোতা, দর্শক ও পাঠক, তখন থেকেই এই শব্দযুগল কানে উঠে আসছে, চোখে ভেসে উঠছে। গণমাধ্যমে কাজ করতে এসে নিত্য মোলাকাত হচ্ছে এরসঙ্গে। অতীত থেকে বর্তমানে এসে পৌঁছতে নিঃসন্দেহে বিচ্ছিন্ন ঘটনার ঘনত্ব বেড়েছে। ঘনত্ব বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে- সকল ঘটনা-দুর্ঘটনাকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সম্বোধন করা। রাষ্ট্র বা সরকার নিজের ওপর কোনও ঘটনার দায় না নেওয়ার জন্যই এই সম্বোধন আবিষ্কার করেছে। যেহেতু অধিকাংশ ঘটনার মামলা বা বিচার পূর্ণতা পায় না, দায়ী ব্যক্তিরা প্রায় অধরাই থাকে, সেহেতু একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটু ঘটনার যোগসূত্র স্বীকার করে নিলে দায় পড়ে সরকারের কাঁধে। প্রশ্ন উঠবে কেন আগের ঘটনাগুলোর মামলার অগ্রগতি নেই? কেন অভিযুক্তদের আটক করা যায়নি বা দায়ী ব্যক্তিকে কেন বিচারের আওতায় আনা যায়নি? এর সরল উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা সরকারের থাকে না।

ভোটের রাজনীতি, ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতির স্বার্থে সরকারের দিক থেকে বরাবরই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন আলমিরায় রাখার চেষ্টা থাকে। এই চেষ্টায় যে তারা যে সফলকাম হয়েছে, তা বলা যাবে না। কারণ জনগণের কাছে ঘটনাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনার সহজেই মালা গাঁথতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র নানা কৌশলে বিচ্ছিন্নতার মালা গাঁথার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এই চেষ্টার ফলাফল সেই বুমেরাং অস্ত্রের মতো এসে রাষ্ট্রকে বিদ্ধ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র যেভাবে সকল ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে শেখাতে চায় জনগণকে। জনগণ শিক্ষার উল্টো ফলাফল দেখায়। তারা বিচ্ছিন্ন ঘটনার মালা ঠিকই গেঁথে ফেলতে পারছে। এই মালা গাঁথতে গিয়ে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতামুখী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিজেদের একটি বিচ্ছিন্নতার সম্পর্ক তৈরি করে ফেলে। কারণ তারা তখন রাজনৈতিক শক্তির বয়ানে বিশ্বাসী হতে পারে না। দুই পক্ষের অবিশ্বাসে কোনও সম্পর্ক তৈরি বা টেকসই হওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষ বা নাগরিকদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাজনীতি বিমুখতা বাড়ছে নতুন প্রজন্মের মাঝেও। রাজনৈতিক দলগুলো সমাজে বা রাষ্ট্রে একটি ক্ষমতার শ্রেণি তৈরি করেছে। তারা ভাবছে সেই শ্রেণি যদি একাট্টা থাকে তবে তো রাজনৈতিক মঞ্চ টেকসই সুনিশ্চিত। এটিও একটি বিচ্ছিন্ন চিন্তা।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়ে তৈরি কোনও মঞ্চ কখনওই উপভোগ্য হবে না। এ কথা জনমানুষদের বেলাতেও প্রযোজ্য। বিশ্বাস হারিয়ে নিজেদের প্রত্যাহার করা যাবে না। বিচ্ছিন্নতাকে মালায় পরিণত করতে বাধ্য করতে হবে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির কুশীলবদের। উভয়পক্ষকেই স্মরণে রাখতে হবে বিচ্ছিন্নতা একটি রোগ। যার পরিণাম পরাজয় ।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com